মাস্টারি বিডি ডটকম
ঢাকা । ২৩ আগস্ট ২০১৭ । ০৮ ভাদ্র ১৪২৪
বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী অভিনেতা এবং চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক নায়করাজ রাজ্জাকের দাফন আজ বুধবার সকালে সম্পন্ন হয়েছে।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর সংবাদমাধ্যমকে জানান, সকাল সোয়া ১০ টায় নায়করাজকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তার কানাডা প্রবাসী মেজছেলে রওশন হোসেন বাপ্পি আজ ভোরে ঢাকায় ফেরার পর তার দাফন সম্পন্ন করা হয়।
তিনি বলেন, পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গণ শাসন করে যাওয়া এ অভিনেতাকে যখন কবরে শোয়ানো হয়, তখন ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছিল। এ সময় তার তিন ছেলে, মেয়ে জামাই, আত্মীয়-স্বজন, গুণমুদ্ধ শুভানুধ্যায়ীসহ চলচ্চিত্র অঙ্গণের অনেকে উপস্থিত ছিলেন। তিনি নিজেও সেখানে উপস্থিত ছিলেন জানিয়ে আরো বলেন, নায়করাজের মরদেহ কবরে শায়িত করার জন্য তার বড় ছেলে বাপ্পারাজ, ছোট ছেলে সম্রাট কবরে নেমেছিলেন।
মিশা সওদাগর বলেন, মঙ্গলবার বিকাল ৩ টায় গুলশান আজাদ মসজিদে রাজ্জাকের দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার পরেই তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করার কথা ছিল। কিন্তু তখন জানা গেল, তার দ্বিতীয় পুত্র বাপ্পি, বাবাকে একনজর দেখার জন্য দেশের উদ্দেশে কানাডা ত্যাগ করেছেন। তাই গতকাল আর দাফন না করে তার মরদেহ ইউনাইটেড হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছিল। আজ ভোরে বাপ্পি দেশে ফিরে এসেছেন।
তিনি আরো জানান, শুক্রবার বিকাল ৫ টায় পরিবারের পক্ষ থেকে গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদে দোয়া-মাহফিল হবে। শনিবার সকাল ১০ টা থেকে দিনব্যাপী এফডিসিতে আলোচনা সভা ও কাঙ্গালীভোজের আয়োজন করা হয়েছে।
বাঙালির প্রিয় ৭৫ বছর বয়সী এ অভিনেতা বেশ কিছুদিন ধরে নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। সোমবার বিকেলে কার্ডিয়াক এ্যাটাক হলে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ডাক্তারদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি সন্ধ্যা ৬ টা ১৩ মিনিটে ইন্তেকাল করেন।
বাংলাদেশের মানুষের কাছে নায়করাজ রাজ্জাক নামে খ্যাত এ অভিনেতা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সাদা কালো যুগ থেকে শুরু করে রঙিন যুগ পর্যন্ত দাপটের সাথে অভিনয় করে গেছেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

মঙ্গলবার সকালে রাজ্জাকের কফিন নেয়া হয় তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল এফডিসিতে। সেখানে প্রথম জানাজার পর দুপুরে তাকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হয়। সেখানে সর্বস্তরের মানুষ কিংবদন্তী এই অভিনেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানায়।
অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার টালিগঞ্জে ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি রাজ্জাকের জন্ম। টালিগঞ্জের খানপুর হাইস্কুলে পড়ার সময় নাটকের মধ্যে দিয়ে তার অভিনয় শুরু। কলেজে পড়ার সময় ‘রতন লাল বাঙালি’ নামে একটি সিনেমার অভিনয় করেন তিনি।
অভিনেতা হওয়ার মানসে ১৯৬১ সালে কলকাতা থেকে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমালেও সেখানে সফল না হওয়ায় আবার ফিরে আসেন টালিগঞ্জে। কিন্তু কলকাতায়ও পরিস্থিতি অনুকূল না হওয়ায় ১৯৬৪ সালে ঢাকায় চলে আসেন।
সে সময় বর্তমান বাংলাদেশ টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হলে সেখানে রাজ্জাক অভিনয়ের সুযোগ পান। তখন ধারাবাহিক নাটক ‘ঘরোয়া’য় অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।
কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল চলচ্চিত্রে অভিনয় করা। আবদুল জব্বার খানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ না পেলেও তিনি সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন।
সেই সময়ের সংগ্রামের কথা রাজ্জাক নিজেই বলে গেছেন এভাবে- ‘আমি আমার জীবনের অতীত ভুলিনি। আমি এ শহরে রিফিউজি হয়ে এসেছি। স্ট্রাগল করেছি, না খেয়ে থেকেছি। যার জন্য পয়সার প্রতি আমার লোভ কোনোদিন আসেনি।’
সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার মধ্যেই ‘তেরো নাম্বার ফেকু ওস্তাগার লেন’ চলচ্চিত্রে ছোট একটি ভূমিকায় রাজ্জাক অভিনয় করেন। এরপর ‘ডাকবাবু’, উর্দু ছবি ‘আখেরি স্টেশন’সহ কয়েকটি চলচ্চিত্রে ছোট চরিত্রে তিনি অভিনয় করেন।
রাজ্জাক এ সময় জহির রায়হানের নজরে পড়েন। তিনি ‘বেহুলা’য় লখিন্দরের ভূমিকায় রাজ্জাককে অভিনয়ের সুযোগ দিলেন সুচন্দার বিপরীতে। ‘বেহুলা’ ব্যবসাসফল হওয়ায় তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।
সুদর্শন নায়ক রাজ্জাক সে সময় সুচন্দার পর শবনম, কবরী, ববিতা, শাবানাসহ তখনকার প্রায় সব অভিনেত্রীকে নিয়ে একের পর এক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র উপহার দিতে থাকেন ঢালিউডকে। এর মধ্যে রাজ্জাক-কবরী জুটি ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়।
সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘আবির্ভাব’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রাজ্জাক-কবরী জুটির শুরু। তারা একের পর এক ছবিতে অভিনয় করেছেন। ‘নীল আকাশের নীচে’; ‘ময়নামতি’; ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘ঢেউ এর পরে ঢেউ’ এবং স্বাধীনতার পর ‘রংবাজ’; ‘বেঈমান’সহ বেশ কিছু দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্র উপহার দেন এ জুটি।
রাজ্জাকের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘আনোয়ারা’; ‘সুয়োরাণী-দুয়োরাণী’; ‘দুই ভাই’; ‘মনের মতো বউ’; ‘জীবন থেকে নেয়া’; ‘নীল আকাশের নীচে’; ‘ময়নামতি’; ‘ক খ গ ঘ ঙ’; ও ‘বেঈমান’।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ‘রংবাজ’ দিয়ে বাংলাদেশে অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রের সূচনা ঘটান রাজ্জাক। এরপর ‘পিচ ঢালা পথ’, ‘স্বরলিপি’, ‘কি যে করি’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘বাদী থেকে বেগম’, ‘আনার কলি’, ‘বাজিমাত’, ‘লাইলি মজনু’, ‘নাতবউ’, ‘মধুমিলন’, ‘অবুঝ মন’, ‘সাধু শয়তান’, ‘পাগলা রাজা’, ‘মাটির ঘর’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘কালো গোলাপ’, ‘নাজমা’সহ অসংখ্য ব্যবসা সফল চলচ্চিত্রের নায়ক হিসেবে রাজ্জাককে পর্দায় দেখেছে দর্শক।
তার অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র হলো ‘কার্তুজ’ এবং তার পরিচালনায় শেষ চলচ্চিত্র ‘আয়না কাহিনী’।
অভিনয়ের জন্য নায়করাজ রাজ্জাক ৫ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অনেক সম্মাননা পেয়েছেন । ২০১৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে তাকে আজীবন সম্মাননা দেয়া হয়। ২০১৫ সালে তিনি পান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কার।
বদনাম, সৎ ভাই, চাপা ডাঙ্গার বউসহ ১৬টি চলচ্চিত্র রাজ্জাক পরিচালনা করেছেন। তার মালিকানাধীন রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশন থেকেও তিনি বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
অভিনয় জীবনের বাইরে নায়ক রাজ্জাক জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের শুভেচ্ছা দূত হিসেবেও কাজ করেছেন। বাসস
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম