Home / পর্যটন / ভ্রমণ : ঘুরে এলাম কক্সবাজার
coxsbazarseabeachmbd

ভ্রমণ : ঘুরে এলাম কক্সবাজার

…মনোরম দৃশ্য, মানুষের ভালোবাসা, সবকিছু মিলিয়ে কক্সবাজার ছাড়তে ইচ্ছা করছিল না। তবুতো আসতেই হয়, এটাই তো নিয়ম। এটাই তো প্রকৃতি…

মাস্টারি বিডি ডটকম
ঢাকা । ০১ ডিসেম্বর ২০১৬ । ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩

পূজোর ছুটি, ভাবলাম কোথাও বেড়িয়ে আসি। ঠিক করলাম কক্সবাজার যাব। আমরা দুইজন, সাথে ছেলে তুর্য, মেয়ে সেজুতি ও জেনিফার। ওদের আনন্দ ধরে না। ৬ অক্টোবর ২০১৬ রাত ৯ টার কোচে কক্সবাজারের উদেশ্যে রওনা হলাম। ঢাকায় পৌঁছার পর ভাবলাম, আমাদের বিশ্রামের প্রয়োজন, হোটেলে উঠলাম। সারাদিন বিশ্রাম নেওয়ার পর রাত সাড়ে ৮ টার নৈশ্য কোচে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। যাওয়ার পথে এক রেস্টুরেন্টের সামনে যাত্রী বিরতি, আমরা খাওয়া দাওয়া সেরে নিলাম। ভোর ৫ টায় কক্সবাজার পৌঁছলাম। ছোটভাই বায়োজিদের ব্যাচমেট ট্রাফিক সার্জেন্ট আমাদের জন্য আগেই হোটেল বুকিং করে রেখেছিলেন। আমরা সেই হোটেলে উঠলাম। এসি হোটেল খুবই পছন্দনীয়। হোটেলটিতে ব্রেকফাস্ট সবার জন্য ফ্রী। আইটেমের শেষ নেই। ভুনা খিচুরি, ডিম, সবজি, পরটা, সেমাই, জুস, কফি, কোল্ডড্রিংকস ইত্যাদি। তবে এগুলো তুলে দেওয়ার কেউ নেই, ইচ্ছে মতো তুলে খেতে হয়। আমরা সকালের নাস্তা সেরে নিলাম।

cocksbazarmbd-0

হোটেল থেকে বের হয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। এক সিএনজি’র ড্রাইভার এসে বললেন- মামা কোথায় যাবেন? আমরা বললাম ঘুরতে এসেছি, বিচে যাব। সিএনজি রিজার্ভ করে নিলাম। ড্রাইভার আমাদেরকে প্রথমে পাহাড়ের বিভিন্ন ঝর্নায় নিয়ে গেলেন। পাহাড় থেকে অঝর ধারায় ঝর্না নেমে আসছে, কী অপরূপ দৃশ্য! আমরা উপভোগ করলাম, ড্রাইভার মাঝে মাঝে আমাদের ছবি তুলে দিয়ে সহায়তা করলেন। ওদের মামা সম্বোধন ও ব্যবহার দেখে মনে হলো ওরা অনেক বেশি অতিথি পরায়ন। পাহাড়ি ঝর্না ও পাশের সমুদ্রের জোয়ার দেখে আমরা পুলকিত। এরপর চলে গেলাম হিমছড়ি। পাশেই আর্মিদের বসবাসের একটি জায়গা। হিমছড়িতে একটি বাজারও আছে। আমরা টিকিট করে ভিতরে ঢুকলাম, সিঁড়ি বেয়ে অনেক উপড়ে উঠতে হয়। কিছু দূর উপরে ওঠার পর আর শক্তি পাচ্ছিলাম না, নিচে তাকালেও ভয় লাগছে। আবার চিন্তা করছি জেনিফারের জন্য কিছু খাবার নিলাম না কেন? কিন্তু নেমে উঠাও সম্ভব নয়। তাই উঠতে শুরু করলাম। পাহাড়ে উঠার পর দেখলাম কী আশ্চর্য! সেখানেও অনেক দোকানপাট রয়েছে। ওখানেই ডাবের পানি খেয়ে নিলাম। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটির পর আমরা পাহাড় থেকে নেমে ঝর্নার পাড়ে এলাম। এরপর ঝর্নার পাড়ের সাজানো গুছানো বাজারে প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটা করলাম। এবার হিমছড়ি ত্যাগ করে সুগন্ধা পয়েন্টের লাবনী বিচের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। লাবনী বিচে এসে আমরা সমুদ্রে নামলাম। ছেলে মেয়েরা গোসল করে নিল। সমুদ্রের কী অপরূপ দৃশ্য! জোয়ার আসার সাথে সাথে বালুময় তীর পানিতে ভরে যাচ্ছে। আমরা পানিতে হাঁটাহাঁটি করছি, কী যে ভালো লাগছিল, বলে শেষ করা যাবে না! আবার ভয়ও লাগছিল। হোটেলের পরিচ্ছন্ন পানিতে গোসল সেরে খাওয়া দাওয়া শেষে রিজার্ভ গাড়িতে সাফারি পার্কের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্ক। দেখতে প্রায় সুন্দর বনের মতো। প্রাচীরের ভিতরে ৭ কি:মি: হেঁটে বেড়ানো সম্ভব নয় তাই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গাড়ি নিলাম এবং ঘুরে-ফিরে দেখলাম। শুধু হিংস্র প্রাণীদের খাঁচার মধ্যে রাখা হয়েছে- বাকি সব প্রাণী মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরছে। হরিণ, বানর, বুনো বেড়াল ওরা যেন নিজ স্বর্গের অধিবাসী। এতবড় বন, বনের ভিতরে নির্জন রাস্তা বেশ ভালই লাগছিল। পার্কের ভিতরে একটা মিউজিয়ামও আছে।

coxsbazarsculpturembd-copy

ভ্রমণ তো আসলে একটি শিক্ষামূলক বিষয়। এসব দেখে অভিজ্ঞতা বাড়লো। ফিরে এলাম হোটেল । পরের দিন ঠিক একইভাবে সকালের নাস্তা সেরে আমরা একটি মাইক্রোবাস রিজার্ভ করি। ড্রাইভার ছিল খুবই দক্ষ ও আন্তরিক। আমরা ড্রাইভারকে বললাম, টেকনাফ যাব। চলতি পথে তিনি আমাদেরকে বুঝিয়ে বললেন, রাস্তায় থাকা দর্শনীয় সকল স্থান দেখিয়ে নিয়ে যাবেন। লক্ষ্যস্থল ইনানী বিচ। অনেক দূরের রাস্তা। সাগরের তীর ১১১ কিলোমিটার, তার মধ্যে আমরা ৬০ কিলোমিটার সাগরের তীর দিয়ে গেলাম। রাস্তার এক পাশে পাহাড় আর এক পাশে সাগর দুয়ে মিলে এক অপরূপ দৃশ্য! দু’পাশের দৃশ্য দেখে আমাদের চোখ জুড়িয়ে গেল। সাগরে প্রবল জলধারা অনেক ভালো লাগছিল। সাথে সাথে বদল হচ্ছে পানির রং। আমরা বিভিন্ন স্পটে থামলাম। সেজুতি, জেনিফার, তুর্য সবাই ঝিঁনুক কুড়াল, খুব আনন্দ করল। সাগরের বালুময় তীরে অনেক বড় বড় কালো পাথর। সেগুলোতে দাঁড়িয়ে আমরা ছবি তুললাম। চলতি পথে চিংড়ি হেচারি দেখলাম। এরপর চোখে পড়ল ‘নীলিমা’ অপরূপ সুন্দর, অনেক বড় প্রসাদ, ছোট বড় অনেকগুলো টং। চারপাশে অসংখ্য নারিকেল গাছ ও সুপারি বাগান। এভাবে তীর বেয়ে যেতে যেতে মেয়ে জেনিফার বলল, কত্ত বড় মাছ! দেখি ঠিকই তো, আসলে সেটি মাছ নয়, ছিল হাঙ্গর। চার জন জেলে জাল পেঁচিয়ে নিয়ে আসছিল। আমরা ভালোভাবে দেখলাম।

cocksbazarjharnambdএরপর আবার যাত্রা শুরু হলো। রাস্তার একপাশে পাহাড় আরেক পাশে সমুদ্র, মাঝ পথ ধরে গাড়ি হু-হু করে যাচ্ছে, কোথাও উঁচু কোথাও নিঁচু, এভাবে গাড়ি যেতে যেতে আমরা জিরো পয়েন্ট টেকনাফে পৌঁছে গেলাম। একটি ছোট্ট হোটেলে নাস্তা করে টেকনাফে বিচে গেলাম। কী অপরূপ দৃশ্য! অপর দিকে মায়ানমারে নাফ নদী এসে পড়েছে বঙ্গোপসাগরে, এক বিশাল সাগর দেখে অবাক হলাম জলরাশির সাগর তীরে দাঁড়িয়ে আমরা মায়ানমারের পাহাড় দেখে নিলাম। অনুভব করলাম, তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ। চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার। বাংলাদেশের দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর পূর্বে মায়ানমার নাফ নদী বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়ে বাংলাদেশ এবং মায়ানমারকে বিভক্ত করেছে।

এবার আমরা সরাসরি মহাসড়কে উঠে যাত্রা শুরু করলাম সেন্ট মার্টিন দ্বীপের ফেরিঘাটের উদ্দেশ্যে। আসার পথে অবলোকন করলাম, লবণচাষিদের চাষাবাদ পদ্ধতি। চোখে পড়লো মধুমতি লবণ উৎপাদন কেন্দ্র। মজার ভিতর মাঝে মাঝে ভয়ও জেগেছে, কোন কোন জায়গায় লেখা আছে, ‘সাবধান বুনো হাতির দল’। নির্জন রাস্তা, গা ছম ছম করছে। রাস্তা থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে রামু সেনানিবাস ও মন্দির, আমরা সেখানে বেশিক্ষণ অবস্থান করলাম না। কারণ সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে আসছে। গাড়ি ঘুরিয়ে নিলাম। আমরা পৌঁছে গেলাম হোটেলে।

পরদিন সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। ট্রাফিক সার্জেন্ট সাইফুর রহমান ও লিয়াকত সাহেব আমাদেরকে যে সেবা দিয়েছেন তাঁদের ধন্যবাদ দিয়ে খাটো করতে চাই না। তবে কৃতজ্ঞতা জানাতেই হয়। যাক ওসব কথা, ঐদিন সকালবেলা একটু ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল, আমরা হোটেলের ভিতরে কিছুক্ষণ থাকলাম। হোটেলের দারোয়ান গাড়ি নিয়ে আসলেন। আমরা গাড়ি রিজার্ভ করলাম, পুরো জেলা শহর ঘুরে দেখব। শুরু হলো আমাদের যাত্রা। কক্সবাজার মূল শহর পরিদর্শন। উঁচু টিলার উপর, জেলার প্রশাসকের বাসভবন, সার্কিড হাউস, জেলা পরিষদ বাংলো, এসপির বাসভবন এগুলো প্রায় পাশাপাশি। এরপর চলে গেলাম পর্যটক মোটেল, বৌদ্ধমন্দির, চিংড়ি হেচারি, কক্সবাজার বিমানবন্দর। ছেলে মেয়েরা খুবই মজা করছিল, বিমানগুলো গুনছিলো একটা, দুইটা, চারটা, পাঁচটা, নয়টা এভাবে আমরা বিমান বন্দর ত্যাগ করলাম এবং মহেশখালি ঘাঁটে পৌঁছালাম।

nafrivermbd

এরপর কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী শুঁটকির বাজার দেখার সাধ জাগলো, গেলাম শুঁটকি বাজার। ৫শ, ১ হাজার থেকে চার হাজার টাকায় পাওয়া যায় এক কেজি শুঁটকি মাছ। তবে আমাদের নেওয়া হলো না। কারণ, আমরা ঢাকায় থাকবো।

এবার চলে গেলাম সামুদ্রিক মাছের বাজার দেখতে। ট্রাকে লোড করে সামুদ্রিক মাছ পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। চোখে পড়লো শাপলাপাতা, রূপচাঁদা চিংড়িসহ নাম না জানা আরো অনেক মাছই। এবার চলে এলাম আবহাওয়া কেন্দ্র রাডার অফিসের সামনে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, সূর্য প্রায় ডুবু ডুবু, গেলাম লাবনী বিচে। গোধূলী লগ্নের সূর্য ডোবার দৃশ্য আমাদের ভিন্নজগতে পৌঁছে দিল।

ভ্রমণ ক্ষণের সমাপ্তি- এবার ঢাকায় ফেরার পালা। গাড়ি রাত ১০ টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে কক্সবাজার ছাড়ছে। মনোরম দৃশ্য, মানুষের ভালোবাসা, সবকিছু মিলিয়ে কক্সবাজার ছাড়তে ইচ্ছা করছিল না। তবুতো আসতেই হয়, এটাই তো নিয়ম। এটাই তো প্রকৃতি। ৬ থেকে ১২ অক্টোবর, জীবন স্মৃতির এ ছয়টি দিন, মনে থাকবে চিরদিন।

ইয়াছমিন বানু বৃষ্টি : লেখক ও শিক্ষক

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

12 4 2026 66

৯২ তে থামলেন আশা ভোসলে

ঢাকা, রবিবার ১২ এপ্রিল ২০২৬ মাসস প্রয়াত বর্ষীয়ান সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোসলে। বয়স হয়েছিল ৯২। শনিবার সন্ধ্যাবেলা হঠাৎই …

Leave a Reply

Your email address will not be published.