মাস্টারি বিডি ডটকম
পিরোজপুর । ০৫ মে ২০১৭ । ২২ বৈশাখ ১৪২৪
পিরোজপুর শহরের বলেশ্বর নদের বধ্যভূমিতে ১৯৭১-এর ৫ মে বর্বর পাক হানাদার বাহিনী হত্যাকান্ড চালায়। এ সময় হত্যা করে পিরোজপুরের মহাকুমা প্রশাসক আ. রাজ্জাক, প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট সাইফ মিজানুর রহমান এবং মহকুমা পুলিশ অফিসার ফয়জুর রহমান আহমেদকে (প্রয়াত জনপ্রিয় উপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ ও ড. জাফর ইকবালের পিতা)। এদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে জীবনবাজি রেখে সবচেয়ে বেশি দুঃসাহসিক ভূমিকা রেখে ছিলেন সাইফ মিজান।
নড়াইল মহাকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ্ডভোকেট আফছার উদ্দিন আহম্মেদের ঘরে ১৯৪২ সালের ৩ ডিসেম্বর জন্ম নেয়া মীজানুর রহমান মাত্র ১০ বছর বয়সে পিতার হাত ধরে ভাষা আন্দোলনের মিছিলে অংশ নেন। ১৯৫৭ সালে নড়াইল শহরের দুর্গাপুর মাঠে বিশাল এক জনসভায় বঙ্গবন্ধুর উৎসাহে বক্তৃতা করে সকলকে মুগ্ধ করে সাইফ মীজান। বঙ্গবন্ধু তাকে কোলে নিয়ে হাজার হাজার জনতার সামনে মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেন।
১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারির পর মীজানকে গ্রেফতার করে নির্যাতন চালিয়ে নড়াইল কারাগারে প্রেরণ করা হয়। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র মীজান কুখ্যাত হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্টবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে কারাবাস করেন। ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সাহিত্য ও পত্রিকা সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কুখ্যাত গভর্নর মোনায়েম খানের যোগদান প্রতিহত করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকারের তীব্র রোষানলে পড়েন মীজান। তারই ফলশ্রুতিতে সি.এস.পি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হলেও চাকরিতে যোগদান করতে দেয়া হয়নি। সেই বছরই তিনি পূর্ব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (ই.পি.সি.এস) উত্তীর্ণ হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট পদে যোগদান করেন।
১৯৭১ সালে পিরোজপুরের প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট ও ট্রেজারী অফিসার থাকা অবস্থায় ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেদিন দুপুরেই পাকিস্তান সরকারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাকুমা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি পাকিস্তান জাতীয় সংসদের সদস্য (এম.এন.এ) এ্যাড. এনায়েত হোসেন খানের নিকট ট্রেজারীর সকল রাইফেল ও গুলি হস্তান্তর করেন। পিরোজপুর শহরের ৮টি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের ডাল-ভাতেরও ব্যবস্থা করেন এই অকুতোভয় স্বাধীনতা সংগ্রামী। ৩ মে ৩২ পাঞ্জাবের ৩ প্লাটুন রক্ত পিপাসুু হানাদার কর্নেল আতিকের নির্দেশে পিরোজপুর শহরে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করলে প্রতিহতের চেষ্টা করতে গিয়ে মীজান গুলিবিদ্ধ হয়ে ধরা পড়েন। ৫মে শহরের বলেশ্বর খেয়াঘাটের বধ্যভূমিতে নিয়ে তাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়। যতবার তাকে আঘাত করা হয়েছে ততবারই তিনি শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিয়েছেন।
স্বাধীনতার বেদিমূলে আত্মহুতি দেয়া সদ্য বিবাহিত মীজানের লাশটি খরস্রোতা বলেশ্বর নদের পানিতে ভেসে যায়। আজও তার স্বজনেরা তার লাশের সন্ধান পাননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় অর্থনীতির উপর রচিত তার বইগুলো ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। তার রচিত প্রবাল, প্রতিবিম্ব, অনেক তারার ঘর এবং ক্রান্তিকালের অবকাশ নাটকগুলো খুই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। এসব নাটকে বাঙ্গালীদের উপর শোষন নির্যাতনের বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছিল।
স্বাধীনতা অর্জনের পর জাতির পিতা প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নড়াইলে গিয়ে সন্তানহারা পিতা আফছার উদ্দিনকে বুকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। পিরোজপুর ও নড়াইলে মীজানুর রহমানের নামে দুইটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার শহীদ মীজানের নামে ডাক টিকেট প্রকাশ করে তার স্মৃতিকে অম্লান করেছিলেন। আর ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার মীজানুর রহমানকে স্বাধীনতা পদক দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও সাইফ মিজানের বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী ড. মোঃ ফরাস উদ্দিন তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেমের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, তার সামনে দুটি সরকার থাকলেও তিনি পাকিস্তান সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে মুজিবনগর সরকারের আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন।
সাইফ মিজানের মৃত্যু বার্ষিকীতে পিরোজপুরে অবিনাশী সাইফ মিজান ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করবে মুক্তিযোদ্ধারা। এছাড়া তার পরিবারের পক্ষ থেকে ঢাকা এবং নড়াইলে দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
এদিকে ৯নং সেক্টরের সুন্দরবন সাব সেক্টর কমান্ডার মেজর (অবঃ) জিয়াউদ্দিন আহমেদ, সাইফ মিজানুর রহমানের অবিস্মরনীয় অবদানের স্মৃতিচারণ করে বলেন, বঙ্গবন্ধু’র স্বাধীনতার ঘোষণার দিন থেকে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি যা যা করেছেন আমাদের অনেকেই তা করতে পারেন নি। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক প্রবীণ আইনজীবী এম এ মান্নান সংবাদমাধ্যমকে জানান, সাইফ মিজানুর রহমান শুধুমাত্র একজন উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন না, ছিলেন একজন মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। ৫মে এলে তাকে বেশি বেশি মনে পড়ে।
এবছর স্বাধীনতা পদক পেলেন মহকুমা পুলিশ অফিসার শহীদ ফয়জুর রহমান আহম্মেদ। তাকে মরণোত্তর পদক দেয়ায় শহীদের সন্তান বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. জাফর ইকবাল প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
সূত্র : বাসস
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম