Home / সাহিত্য / গল্প / পিতা : ইফরানা ইকবাল
father+mbd-f

পিতা : ইফরানা ইকবাল

…শিউলি চিঠিটা হাতে নেয়। ছাঁদে যায়। অনেকগুলো গ্যাস বেলুনের সাথে সুতো বেঁধে বাবাকে লেখা চিঠিটা সুতোর মধ্যে গেঁথে আকাশে উড়িয়ে দেয়। তারপর রাস্তায় নেমে আসে। যা ভেবেছে তাই! ছেলেটা আজকেও দাঁড়িয়ে আছে। শিউলিকে বের হতে দেখেই চমকে হাতের ফুলগুলো লুকিয়ে ফেললো। শিউলি কিছুক্ষন দাড়িয়ে রইল। ছেলেটার দিকে তাকাল। কি গভীর ভালবাসা ছেলেটার চোখের মধ্যে।…

 

প্রিয় বাবা,
কেমন আছ? প্রথমেই তোমাকে দুই মুঠো স্নিগ্ধ,শুভ্র বেলি ফুলের শুভেচ্ছা..। জান, বাবা? আমার বয়স এখন ১৬বছর। আজকে আমার ১৬তম জন্মদিন। বাবা, সবাই বলে আমি নাকি অনেক মিষ্টি দেখতে। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছা করে যে, তুমি আমার দিকে তাকিয়ে বলবে, আমার মেয়েটা তো ভারি মিষ্টি হয়েছে দেখতে। বলেই তুমি আমার গাল টা টিপে দিবে, আমার চুল  গুলো এলোমেলো করে দিবে। কিন্তু তা কখন সম্ভব কিনা আমি তা জানি না। আমি তো এটাই জানিনা, যে তুমি কে, কোথায় আছ! দেখতে কেমন। এটা আমি কখনই ভাবিনা যে তুমি বেচে নেই! ভাবতে চাইনা! আমি জানি যে কোথাও না কোথাও তুমি নিশ্চয় আছ। আচ্ছা বাবা, তোমার চোখ কেমন? নাক? ঠোঁট? আমার মত তোমারো কি ঠোঁটের নীচে তিল আছে? বাবা, আমার সমুদ্র দেখতে ইচ্ছা করে। পানির উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া গাঙচিল  দেখতে ইচ্ছা করে। অনেক ইচ্ছা করে! কিন্তু   আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে তুমি নেই বাবা!আমি তোমাকে খুব ভালবাসি বাবা। যদিও তোমাকে আমার ভালবাসা উচিৎ না। অনেক বেশি রাগ থাকা উচিৎ। কিন্তু আমি তোমার উপর রাগ করতে পারিনা! কারন তোমার জন্যইতো  আমার অস্তিত্ব। আমার মিশন স্কুলের ফাদার আমাকে বলেছেন যে তুমি খুব গরীব,অভাবী ছিলে, আমাকে যখন তুমি এখানে ফাদারের কাছে দিয়ে গেলে তখন আমার বয়স মাত্র এক বছর।  তুমি অনেক চেষ্টা করেছ আমাকে তোমার কাছে রাখার জন্য। কিন্তু পারনি, কারন আমার আরো পাঁচ জন ভাইবোন আছে। তোমার হতদরিদ্র সংসারে আমাকে লালন করা সম্ভব ছিলনা। আর তার চেয়েও বড় কথা আমি জন্ম থেকেই বাক প্রতিবন্ধি !  আমি বোবা!আমাকে নিয়ে তোমার ভাবনার অন্ত ছিলনা। তাই সব দিক চিন্তা করে তুমি আমাকে এখানে দিয়ে গেলে। এই কথা গুলো সবই আমি ফাদারের কাছে শুনেছি। ফাদার আমাকে বলেছেন, তুমি নাকি খুব কাঁদছিলে! যখন ফাদারের হাতে তুমি আমাকে তুলে দিলে তখন নাকি তুমি মাটিতে দুপা ছড়িয়ে বসে অনেক কাঁদছিলে। এরপর দীর্ঘ ১৬ বছর কেটে গেছে, কিন্তু তুমি আর কোনদিন এখানে আসনি! যেদিন আমাকে তুমি এখানে রেখে গিয়েছিলে, সেদিনটাতেই আমার জন্মদিন পালন করি আমি।

father+mbd-0

এই ১৬ বছরে অনেক কিছুই বদলে গেছে। শুধু বদলায়নি একটা জিনিস, আমি একা ছিলাম, আজো একা আছি। যেই ঠিকানাটা দিয়ে গিয়েছিলে সেখানেও তোমাকে আর পাওয়া যায়নি। আমি বুঝতে পেরেছি বাবা,তুমি পালিয়ে গিয়েছিলে আমার কাছ থেকে। কিন্তু বাবা, শরীর পালালেই কি মনটা পালাতে পারে? তোমার মনটা তো আমার কাছে, নাহলে কেন আমার সব সময় তোমার কথা মনে পরে? ফাদার আমার নাম রেখেছেন শিউলি। আসলেই আমি শিউলি ফুলের মতন। যা সকাল হলেই ঝরে যায়! তবে আমি জানিনা এই শিউলিকে মালা গেঁথে কেউ যত্ন করে তার কাছে রেখে দিবে কিনা! আমি সবার চোখে আমার জন্য করুণা দেখি, কিন্তু ভালবাসা না। আমি কথা বলতে পারিনা। আমি বোবা! ফাদার ছাড়া শুধু মাত্র একজন মানুষের চোখে আমি আমার জন্য ভালবাসা দেখি। আমাদের স্কুলের গেটে রোজ যে ছেলেটা দাড়িয়ে থাকে ফুল হাতে। আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু কিছুই বলেনা। আমাকে দেখলেই ফুলগুলো লুকিয়ে ফেলে। কিন্তু আমার জীবনের কোনও সত্যতাই সে জানেনা। জানলে হয়তো তার চোখেও আমার জন্য করুণা দেখবো। যে গোপন গভীর ভালবাসা সে আমার জন্য পুঞ্জি করে রেখেছে মনের মধ্যে, তা একমুহূর্তেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। আমি জানি আজো সেই ছেলেটা গেটের বাইরে দাড়িয়ে থাকবে। কিন্তু আমি ওকে কখনই আমার সম্পর্কে কিছুই বলবনা। কখনই জানতে দিবনা আমার অক্ষমতা!  আমি আমার জন্য আর কারো চোখে করুণা দেখতে চাইনা বাবা। তার চেয়ে থাকনা, যেমন চলছে চলুক। রোজ নাহয়, একটা ছেলে আমার জন্য ফুল হাতে দাঁড়িয়ে থাকুক। আমাকে জন্মদিনে উইশ করবেনা বাবা?

ইতি
তোমার মেয়ে
শিউলি

শিউলি চিঠিটা হাতে নেয়। ছাঁদে যায়। অনেকগুলো গ্যাস বেলুনের সাথে সুতো বেঁধে বাবাকে লেখা চিঠিটা সুতোর মধ্যে গেঁথে আকাশে উড়িয়ে দেয়। তারপর রাস্তায় নেমে আসে। যা ভেবেছে তাই! ছেলেটা আজকেও দাঁড়িয়ে আছে। শিউলিকে বের হতে দেখেই চমকে হাতের ফুলগুলো লুকিয়ে ফেললো। শিউলি কিছুক্ষন দাড়িয়ে রইল। ছেলেটার দিকে তাকাল। কি গভীর ভালবাসা ছেলেটার চোখের মধ্যে। শিউলি মনে মনে বলল, আমি খুবি দুঃখিত। তোমার ভালবাসার বিনিময়ে আমার কাছে দেয়ার মত কিছুই নেই! আর যদি আমি তা দিতে চাই, কষ্টটা সবচেয়ে বেশি আমিই পাবো! তারচেয়ে থাক। চুপ করে থাকাটাইত আমার নিয়তি। আমি নাহয় চুপ থাকি। তারপর আপন মনেই মুচকি হেসে উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করলো শিউলি।

father+mbd

ফাদার সন্ধ্যার দিকে শিউলির ঘরের সামনে এসে দেখে যে, ঘর অন্ধকার। ঘরের ভিতর তিনটা মোমবাতি জ্বলছে। ফাদার দেখলেন যে, শিউলি বিছানায় উল্টে শুয়ে আছে। ফাদার শিউলির মাথায় হাত রাখলেন। শিউলি মাথা তুলে তাকাল। চোখ অনেক ফোলা। অনেক কেঁদেছে মেয়েটা দেখেই বুঝা যাচ্ছে। ফাদার ইশারায় জানতে চাইলেন, কি হয়েছে মা? উত্তরে শিউলি বলল, আমার জীবনে এত কষ্ট কেন? আমার বাবা কই? মা কই? সবাই আমাকে করুণা করে কেন? ফাদার শিউলির মাথায় হাত রাখে। ওকে সান্তু করার চেষ্টা করে। ওকে ইশারায় বলে যে, তুমি ঈশ্বরের দেয়া উপহার। তিনি তোমাকে ভালবেসে এ ধরণীতে পাঠিয়েছেন। সবাই তোমাকে করুণা করে এ কথাটা ঠিকনা। আমি তোমাকে ভালবাসি মা। আমি তোমার ফাদার। শুধু জন্ম যিনি দেন তিনিই সব সময় পিতা হননা। পিতার  মানে অনেক গভীর! তুমি একদম কাদবেনা। শিউলির ঘরের জানালা দিয়ে একটুকরো চাঁদের আলো এসে ফাদারের মুখের উপর পরে। শিউলি মন্ত্র মুগ্ধের মতন ফাদারের মুখের দিকে তাকিয়ে তার কথা গুলো বুঝতে থাকে। তারপর ফাদারকে জড়িয়ে ধরে অঝরে কাঁদতে থাকে। হ্যাঁ, তাইতো! কে বলছে ওর কেউ নেই। এইতো ফাদার আছেন।

জানালার বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে, ঘরের ভিতর একটুকরো চাঁদের আলোতে একজন পিতা তার অভিমানী মেয়েকে বুকে জড়িয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। কোথা থেকে যেন অনেকগুলো ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে…….।

মাস্টারি বিডি ডটকম । ঢাকা । ০২ মে ২০১৭ । ১৯ বৈশাখ ১৪২৪

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

14 4 2026 9090003

বন্ধ হয়ে গেল দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার

অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ক্রুড অয়েল) তীব্র সংকটের কারণে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি …

Leave a Reply

Your email address will not be published.