মাস্টারি বিডি ডটকম
নড়াইল । ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ২৫ মাঘ ১৪২৩
নড়াইলে তিন উপজেলায় ৭৯৮ জন ভিক্ষুক বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত হয়ে এখন স্বাবলম্বী হবার পথে। ছয়মাস আগে যারা ভিক্ষাবৃত্তি করে সংসার চালাতো- সরকারি উদ্যোগের ফলে তারা এখন অন্য ভালো পেশায় নিয়োজিত হয়ে আয়-রোজগার করছেন। জেলার বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড, ফেরিঘাট, হাট-বাজার, বাসা-বাড়ি, শহর-বন্দর, গ্রামাঞ্চলসহ বিভিন্ন লোকালয় ঘুরে দেখা গেছে, ভিক্ষার জন্য এখন কেউ অন্যের কাছে হাত পাতেন না। ভিক্ষুক হিসেবে কাউকে দেখাও যায় না। প্রতিটি ভিক্ষুকের হাত এখন কর্মীর হাতে পরিণত হয়েছে। কেউ বাজারে বিক্রি করছেন সবজিসহ বিভিন্ন কাঁচামাল। অনেকে আবার গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন করছেন। স্কুল-কলেজের আশ-পাশসহ বিভিন্ন লোকালয়ে বাদাম, ছোলা মুড়ি বিক্রিসহ ছোট মুদি দোকান দিয়েছেন কেউ কেউ।
এদেরই একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী লিটন শেখ (৪৫)। নড়াইলের রূপগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীবাহী বাসে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাদাম বিক্রি করেন তিনি। এখন আর ভিক্ষার জন্য হাত পাতেন না। অথচ এক বছর আগেও বাসযাত্রীদের কাছে ভিক্ষার জন্য হাত বাড়িয়ে দিতেন দৃষ্টিহীন লিটন। সেই হাতেই এখন বাদাম বিক্রি করেন তিনি। প্রতিদিন আয় করেন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। লিটন প্রায় ২২ বছর ধরে ভিক্ষা করতেন। লিটনের মতো ২০ জন দৃষ্টিহীন, দু’জন বধির ও দু’জন বোবাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ৩৯ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কেউ আর ভিক্ষা করেন না এখন।
এক সময়ের আরেক ভিক্ষুক জামাল হোসেন (৬৩)। ১১ বছর যাবত ভিক্ষা করতেন তিনি। এখন নড়াইলের রূপগঞ্জ বাজারে তরকারি বিক্রি করেন। জামাল হোসেন জানান, আগে ভিক্ষা করে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পেতেন। এখন কাঁচামাল বিক্রি করে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা আয় করেন। তবুও খুশি তিনি। কারণ, ভিক্ষাবৃত্তির মতো লজ্জাজনক কাজ ছেড়ে দিয়ে এখন নিজে আয় করেন। তার স্ত্রী ববিতা মিষ্টির প্যাকেট তৈরি করেন।
নড়াইল-যশোর সড়কের পাশে সীতারামপুরের খাস জমিতে একচালা ঘরে বসবাস তাদের।
নাকসী গ্রামের উজেলা বেগম (৩৬) জানান, ১৭ বছরের ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে এখন নাকসীতে বিদ্যালয়ের সামনে মুদি দোকানে ব্যবসা করেন। প্রশাসনের সহযোগিতা পেয়ে দোকান চালুর পর তিনি ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়েছেন। তার বড় ছেলে এসএসসি পরীক্ষার্থী। আরো দুই সন্তানও লেখাপড়া করছে। স্বামী ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে সুখেই আছেন বলে এ প্রতিনিধিকে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জেলায় ৭৯৮ জন ভিক্ষুকের হাত এখন কর্মীর হাতে পরিণত হয়েছে। তিনটি পৌরসভা ও তিনটি উপজেলার ৩৯টি ইউনিয়নে ৭৯৮ জন ভিক্ষুককে চিহ্নিত করে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা করে সব এলাকা ভিক্ষুকমুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে নারী আছেন ৫৫৫ জন এবং পুরুষ ২৪৩ জন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো: সিদ্দিকুর রহমান জানান, প্রায় ১০ মাসের চেষ্টায় নড়াইলকে ভিক্ষুকমুক্ত জেলায় পরিণত করা হয়েছে। ভিক্ষুকদের কর্মমুখী ও পুনর্বাসন করতে এ পর্যন্ত (২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত) পাঁচটি গরু, পাঁচটি ওজন পরিমাপক যন্ত্র, ছয়টি সেলাই মেশিন, ৩০৭টি ছাগল, ৯১০টি হাঁস, ২৯০টি মুরগি, ১৩টি ভ্যান, ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ২৫৩টি দোকান, দুই বান্ডিল টিন ও ছয় হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৪৭ লাখ টাকার পুঁজি সমিতির মাধ্যমে ঋণ সৃষ্টি করে ভিক্ষুকদের মাঝে বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। এদিকে, প্রাপ্যতার ভিত্তিতে ২৭৫ জনকে বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান এবং জিআর চালসহ ইজিপিপি ও ১০ টাকা কেজি দরের চালের সুবিধাও দেয়া হয়েছে। আটজনকে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষকর্মী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। ৭৯৮ জন পুনর্বাসিত ভিক্ষুককে দেখভালের জন্য একজন করে তদারককারী কর্মকর্তা নিয়োজিত আছেন। এক্ষেত্রে শিক্ষক, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য সহকারী, চৌকিদারসহ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের চাকরিজীবীরা স্বেচ্ছাশ্রমে পুনর্বাসিত ভিক্ষুকদের তদারকি করেন।
রূপগঞ্জ বাজারের কাঁচামাল ব্যবসায়ী খোকন দেবনাথ বলেন, আগে যারা ভিক্ষা চাইতো, তাদের অনেকেই আমাদের পাশে বসে সবজিসহ বিভিন্ন তরকারি বিক্রি করছেন। হাত পেতে নয়, কাজ করে আয়ের পথ বেছে নিয়েছেন ভিক্ষুকরা। তাদের কাজের গতি দেখে খুব ভালো লাগে বলে তিনি জানান।
নড়াইল জেলা প্রশাসক মো: হেলাল মাহমুদ শরীফ বলেন, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ জেলাকে ভিক্ষুকমুক্তকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সব এলাকা থেকে ভিক্ষুকদের তালিকা করে তাদের পুনর্বাসনের জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সহযোগিতায় ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন করা হয়েছে।
সূত্র : বাসস
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম