মাস্টারি বিডি ।
ঢাকা । ২৪ জুন ২০১৮ । ১০ আষাঢ় ১৪২৫
দেশে যখন দিনদিন দেশী মাছের প্রজাতির প্রাচুর্য কমে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে টাকি মাছের পোনা উৎপাদনে সফলতা লাভ করেছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা (বিএফআরআই)। বিএফআরআই-এর আওতাধীন সৈয়দপুর স্বাদুপানি উপ-কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা এই সফলতা লাভ করেছেন।
কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় মৌসুমী জলাশয়ে অন্যান্য প্রজাতির মাছের সাথে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদে টাকি মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করা যাবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিএফআরআই-এর মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ সংবাদমাধ্যমকে এই সফলতার কথা নিশ্চিত করেছেন।
বলা বাহুল্য, সুস্বাদু টাকি মাছের ভর্তা বাঙালীর কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
টাকি মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদন বিষয়ক গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন সৈয়দপুর স্বাদুপানি উপকেন্দ্রের প্রধান ড. খোন্দকার রশীদুল হাসান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার নেতৃত্বে সৈয়দপুর স্বাদুপানি উপ-কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শওকত আহমেদ ২০১৭ সালের প্রথম দিকে এই গবেষণা কাজ শুরু করেন। তারা নিরলসভাবে গবেষণা করে চলতি বছরের এপ্রিলে ‘কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদনে’ সফলতা লাভ করেছেন।

গবেষণায় তারা দেখতে পেয়েছেন, কৃত্রিম প্রজননে টাকি মাছের পোনা বাঁচার শতকরা হার প্রায় ৬০ ভাগ। এই পোনা উৎপাদন ও নার্সারী ব্যবস্থাপনার কলাকৌশল মৎস্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে যদি সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণসহ এই প্রজাতিটি ভবিষ্যতে বিলীন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যাবে বলে বিজ্ঞানীরা আশা করছেন।
প্রসঙ্গত, সৈয়দপুর স্বাদুপানি উপকেন্দ্রের প্রধান ড. খোন্দকার রশীদুল হাসান ২০০৯ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকি মাছের প্রজননের উপর পিএইচডি’র ওয়ার্ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তার গবেষণা কর্মের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের ড. মো. ইদ্রিস মিয়া। ২০১৫ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
তিনি আরও বলেন, “কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় মৌসুমী জলাশয়ে অন্যান্য প্রজাতির মাছের সাথে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের মাধ্যমে মাছটির উৎপাদন বৃদ্ধি করা যাবে। এতে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে।”
গবেষণায় অংশগ্রহণকারী সৈয়দপুর স্বাদুপানি উপ-কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শওকত আহমেদ জানান, টাকি মাছের বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে- Channa punctatus. অত্যন্ত সুস্বাদু মাছ হিসাবে পরিচিত টাকি মাছ বাংলাদেশে লাটি, শাটি ইত্যাদি নামে পরিচিত।
তিনি বলেন, একসময় দেশে এ মাছটি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া গেলেও প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে দিন দিন এর প্রাচুর্য কমে যাচ্ছে। বিএফআরআই-এর গবেষণার মাধ্যমে দেশে মাছটির পর্যাপ্ততা নিশ্চিত হবে বলে সৈয়দপুর স্বাদুপানি উপকেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা দৃঢ়ভাবে আশা করছেন।
আইইউসিএন-এর সাম্প্রতিক তথ্যমতে, দেশে স্বাদু পানির ক্ষেত্রে সংকটাপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রজাতির সংখ্যা ৬৫টি।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এক সময় দেশের নদ-নদী ও খাল-বিলে প্রচুর টাকি মাছ পাওয়া যেত। আবাসস্থল বিনষ্ট ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে টাকি মাছ মানুষের খাদ্য তালিকা থেকে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিল। এ প্রেক্ষিতে বিএফআরআই সৈয়দপুর স্বাদুপানি উপ-কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা এ মাছের কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন ও চাষাবাদের উপর ২০১৭ সাল থেকে গবেষণা কাজ শুরু করে।
বিএফআরআই মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ জানান, বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় মাছের সংরক্ষণ ও চাষাবাদ কৌশল উন্নয়নের লক্ষ্যে বিএফআরআই গবেষণা পরিচালনা করে আসছে। ইতোমধ্যে ১৬টি মাছের পোনা উৎপাদনে সফলতা অর্জন করেছেন।
যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাঠি বাজারের একজন মৎস্যচাষী সোলায়মান হোসেনকে টাকি মাছের কৃত্রিম পোনা উৎপাদন বিষয়ক সংবাদ জানানো হলে- এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে টাকি মাছের পোনা উৎপাদনের সংবাদে অত্যন্ত খুশি হয়েছি। এ মাছটির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আগামী মৌসুমে অন্যান্য প্রজাতির মাছের সাথে আমার পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে টাকি মাছ যাতে চাষ শুরু করতে পারি, সে বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে আশা করি। আর টাকি চাষ করলেইতো আমরা বুঝতে পারবো উৎপাদনে লাভ না ক্ষতি হচ্ছে।” বাসস
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম