মাস্টারি বিডি । বাঁধন খান
ফিচার । ০৯ মার্চ ২০১৯ । ২৫ ফাল্গুন ১৪২৫
গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পলো উৎসব মূলত পৌষ মাস থেকে শুরু হয়ে চলতো বৈশাখ জৈষ্ঠ পর্যন্ত। বর্ষার পানি সরে যাওয়ায় অপেক্ষাকৃত নিচু জমিতে বা গর্তে হাঁটু পরিমান পানি অবশিষ্ট থাকতো যেখানে পাওয়া যেতো প্রচুর পরিমাণে দেশী মাছ। এই মাছ শিকারের জন্য গ্রামের ছেলে-বুড়ো সবাই নেমে পড়তো কাদা পানিতে। উৎসবের আয়োজনে সেসব মাছ শিকার করা হতো। বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যের মধ্যে এটাও একটা সংস্কৃতি যে শীত মৌসুমে দল বেঁধে মাছ শিকার করা।

যখন দেশের হাওড়, বাঁওর, ছোট নদী-নালা ও খাল-বিল প্রায় শুকিয়ে যায়। তখন নির্দিষ্ট বিল বা ছোট নদীর আশে পাশে হাট-বাজার, গ্রামগুলোতে মাইকে বা ঢোল পিটিয়ে জানান দেওয়া হতো মাছ শিকারীদের।

জানানোর পর মাছ শিকারী পলো (দেশীয় পদ্ধতিতে মাছ ধরার সরঞ্জাম), টাকজাল, জালি, ক্ষেতজাল, চাবিসহ বিভিন্ন রকম মাছ শিকারের সরঞ্জাম নিয়ে মিছিলের মতো করে উপস্থিত হতো নির্দিষ্ট বিল বা ছোট নদীতে। দলবেঁধে মাছ ধরতে যাওয়ার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। একসঙ্গে এরকম হাজার হাজার মাছ শিকারীদের নির্দিষ্ট বিল বা নদীতে মাছ শিকারকে হাত বাওয়া আবার কোন কোন এলাকায় পলো বাওয়া বলা হয়।

হাত বাওয়া বা পলো বাওয়া উৎসব চলত সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত। এই উৎসবে অনেকে একাধিক বা তার চেয়ে বেশি মাছ পেলেও কেউ কেউ আবার একটি মাছও পেত না। মাছ না পেলেও তাদের কোন দুঃখ থাকত না। দলবদ্ধভাবে মাছ ধরতে যাওয়ার আনন্দটাই মূলত মূখ্য। মাছ প্রাপ্তিটা মূল বিষয় নয়। হাত বাওয়া-পলো বাওয়াকে কেন্দ্র করে বিলের আশপাশে দশ গ্রামে ৩/৪ দিন পূর্ব থেকেই উৎসবের আমেজ চলে আসত। বাড়ির মা-ঝি’রা দল বেঁধে মশলা বাটার পাশাপাশি গীত-সংগীতের আয়োজন করে থাকত। হাত বাওয়া-পলো বাওয়ার পর চলতে থাকত পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে উপহার হিসেবে মাছ পাঠানো। আহা, এ সব এখন কেবলই স্মৃতি!

নানা কারণে এ ‘পলো বাওয়া’ উৎসব এখন আর তেমন দেখা যায় না। ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এ সংস্কৃতি। বিল বা ছোট জলাশয়ে ইতিমধ্যে মৎস্য চাষের আওতায়, আধুনিক সেচ ব্যবস্থার আওতায় আনায় এখন ধীরে ধীরে এ উৎসব হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম অঞ্চল থেকে। ইদানীং মাছশূন্য খাল-বিলে হাত বাওয়া-বিল বাওয়া উৎসব আর দেখা যায় না।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম