
মাস্টারি বিডি ডটকম । শান্তা ইসলাম
ঢাকা । ১ মে ২০১৮ । ১৮ বৈশাখ ১৪২৪
সভ্যতার মে
মে দিবসের ছড়া
পিঠের ঘামে ভরা
মে দিবসের ছড়া
পায়ের রক্তঝরা
মে দিবসের ছড়া
কষ্ট ঝরে পড়া
মে দিবসের ছড়া
বাঁচতে চেয়ে লড়া
মে দিবসের ছড়া
সভ্যতাকেই গড়া।

কামার
লোহার ’পরে হাতুড় পেটায় কারা
মুঠির ভেতর আগুন ঝরে আগুন
কাস্তে কোদাল কে দিয়েছে তাদের
সেই আগুনে রঙিন হলো ফাগুন
টকটকে লাল লোহার শরীর
আগুনপোষা রাতের গভীর চোখ
সে আগুনের ন্যায্য হিসাব ছাড়া
ভুলবে কি কেউ কষ্টবোনা শোক
দু’হাতে যে করছে শাসন
আগুনমাখা লোহার পাত
রোজ সকালে তার কপালে
ক্যান জোটে না পান্তাভাত?

ফুলবানুদের মে-ডে
আজ তাহাদের ছুটি
আজ তাহাদের কাজ নেই
আজ তাহাদের ছুটি
আজ তাহাদের সাজ নেই
আজ তাহাদের ছুটি
আজ তাহাদের কাঁদা নেই
আজ তাহাদের ছুটি
আজ তাহাদের চাঁদা নেই
আজ তাহাদের ছুটি
আজ ফুলবানুদের মে-ডে
আজ নিজের সাথে নিজেই তারা
যাবে নিজের বেডে।

কোদাল চালাও
কোদাল চালাও জোরসে বন্ধু
আঘাত হানো শক্ত মাটিতে
দু’হাতে জমুক চিৎকার যত
ফুরসত নেই জিরান ঘাঁটিতে
কোদাল চালাও জোরসে বন্ধু
এই পাহাড় হবে বসত সমান
পেটে ক্ষুধায় কি যায় এসে
বলবে মহাজন ক্ষুধাটা কমান
কোদাল চালাও জোরসে বন্ধু
নাইবা জানলে মজুরি কত
রক্তচোখের ইশারার জানি
পারবে না ঢাকতে গভীর ক্ষত।
মহাজন
দেখ মহাজন দেখ
প্রজার শরীর দেখ
হাড়হাড্ডির ভেতর থেকে
উৎস কিছু লেখ
লেখ মহাজন লেখ
জয়ের গল্প লেখ
শ্রমজীবী এই প্রজাদের
ওজন নেয়া শেখ।

কুমার
কুমার ঘোরায় চাকা
ভাঙছে হাতের শাঁখা
কলসি পুড়ে লাল
নেই তো ঘরে চাল
উদোম হাঁড়ির মুখ
কাড়ছে মনের সুখ
যুগ যে আধুনিক
হাঁড়ি ননস্টিক
তাই তো কুমার বেকার
বুঝবে কে আর দুঃখ তার

দারোয়ান
সারাদিন হাত ওঠে
সারাদিন হাত নামে
পা করে টানটান
ঠুকছে সেলাম
সারাদিন গেট খোলে
দুই পাশে চাবি দোলে
পা ওঠে পা নামে
ঠুকছে সেলাম
মাঝে মাঝে ভাবে বসে
কষ্ট যে বুকে পোষে
নিজেকেই বলে নিজে
সারাদিন ঘামে ভিজে
কী যে পেলাম!

মালি
রোজ সকালে অবাক হয়ে দেখে
একটি কুঁড়ি গোলাপ হবার জন্যে
সন্ধ্যা থেকে মেলছে সবই দল
মেলে ধরায় সবাই বুঝি হণ্যে
কুঁড়ির পাশে দু’দিন ছিল দুটি
ভালোবাসার আজ নিয়েছে ছুটি
শিশির ভেজা সব কুঁড়িরই বুকে
আঙুল ছোঁয়ায় মালিক মনের সুখে
নিজের কাছে প্রশ্ন করে মালি
ভুলবে সে কি একটু আগের গালি
নরম গলায় বলবে নাকি, স্যার?
কে নেবে এই গোলাপ ঝরার ভার!

মাতবর
সারাদিন ইট ভেঙে
পায় টাকা কুড়ি
শ্রমিকের টাকা মেরে
বাড়ে কার ভুঁড়ি?
মহাজন মাতবর
মজমায় রাতভর
দুই জনে মাটি টেনে
পায় টাকা আশি
পাওনার টাকা মেরে
রোজ খেয়ে খাসি
মহাজন মাতবর
নাক ডাকে রাতভর।

নারী-নেত্রী
তোমায় আমি বলছি শোনো মাগো
আমার কথায় কেন তুমি রাগো
বৃষ্টি মাথায় পাথর ভাঙে অদু
রোদের সাথে যুদ্ধ করে মধু
ওদের এখন বয়স কেবল বারো
ওদের জন্যে চিন্তা নেই তো কারো।
তোমায় আমি বলছি শোনো মাগো
আমার কথায় কেন তুমি রাগো
এই বাড়িতে কাজের মেয়ে মনা
মামার বাড়ির কাজের মেয়ে কণা
ওরা দেখি ছোট আমার চেয়ে
তবু ওরা আমার কাজের মেয়ে!
তবু তুমি নিজেই নারী নেত্রী
আয়নাতে দেখছো নাকি তোর শ্রী কী!

নো-ম্যানস ল্যান্ড
হিলির বর্ডারে
কার যেন অর্ডারে
নোম্যান্সল্যান্ডে ওরা পাঁচ জন
খাওয়া-ঘুম ওখানেই
বাথরুমে ঢোকা নেই
মাথার নিচ ঘিরে শুধু ঘাসবন।
বাংলা যে দুই ধারে
ওরা যাবে কোন পারে
দাবি এক-চায় তারা বাঁচতে
মানবতা খাবি খায়
কে কে তোরা যাবি আয়
চলা আর যাবে না আস্তে।

গার্মেন্টস কর্মী
গার্মেন্টস কর্মী পায় না তো অধিকার
পায় না তো মজুরি যতটুকু কাজ তার
কাজ আর কাজে থাকে তবু দিনরাত
উন্নয়ন ছুঁয়ে আছে তার দুটি হাত
বাবা নেই ভাই নেই মা-ও যে অন্ধ
চাকরিটা রাখতেই মুখটা যে বন্ধ
তবু তার জীবনের নেই কোনো দাম
মাঝপথে থেমে থাকে ডান আর বাম।

কুলি
বস্তা মাথায় হাঁটছে কুলি
সামনে নদী কর্ণফুলী
নাও বাঁধা তার পুরান ঘাটে;
সূর্য যে তার মাথায় হাসে
দুপুরভরা চৈত্র মাসে
ফাটলধরা গাঁয়ের মাঠে।
কুলির বয়স দশ কী বারো
বইছে তবু এসব ভারও
হয়তোবা তার বাবা নেই
মাও গেছে অন্য ঘরে
এই বয়সে জানত কী সে
পড়বে এমন ঘূর্ণিঝড়ে!

মেকানিকস
ইঞ্জিন খোলে নাটবোল্ট খোলে
গাড়ি পাটাতনে তোলে
ফিল্টার খোলে দিল তার খোলে
গাড়ি পাটাতনে তোলে।
গাড়ি পাটাতনে তোলে
মেকানিক তার নিচে ঝোলে
মেকানিক তার গার্ড নিতে ভোলে।
মেকানিক তার কাজ শুরু করে
ভারী বক্সটা যে এক হাতে ধরে
বক্স সরে যায় বক্স পড়ে যায়
পলকেই তার হাত ঝরে যায়।
এখন তার হাত নেই
পেট আছে ভাত নেই।

রিকশাচালক
রিকশাওলার জিগাই যখন
মে দিবসের অর্থ
এক নিমিষে বলতে থাকে
এই যে ধরুন গর্ত!
রাজপথে তো চলতে মানা
গলির ভেতর ডাকাত হানা
মরার আবার শর্ত!
চাষীর কাছে জিগাই যখন
মে দিবসের মানে
গড়গড়িয়ে বলতে থাকে
এই যে ধরুন বানে
জীবন যখন ভাসতে থাকে
নেতারা সব আসতে থাকে
ভোটে জেতার জন্যে
সেবা দিতে হণ্যে!
মে দিবসের অর্থ
মরার আবার শর্ত!
মে দিবসের নেতা
যতই বাজুক শহর জুড়ে
মে দিবসের গান
শ্রমিক থাকুক কুঁড়েঘরে
নেতারা যে চান
যতই বলি দিতেই হবে
তাদের অধিকার
আমরা সবাই ছাড়তে নারাজ
আজব গদিটার।

প্যাডেল
প্যাডেল মারো রে
প্যাডেল মারো জোরে
ইস্টিশনে যেতে হবে
আমায় খুব ভোরে
প্যাডেল মারো রে …
প্যাডেল মারো প্যাডেল
বিশ মিনিটে পৌঁছে দিলে
তোমায় দেব ম্যাডেল।
রিকশা ছোটে রিকশা
চলছে যেন মোটরকার
মালিবাগের মোড়
যেই হয়েছি পার
সামনে এক দানবট্রাক
হারিয়ে তার খেই
ভুলল নিতে বাঁক
সাহসী সেই রিকশাচালক
আমায় বাঁচাতে
পড়ল চাপা তাতে
কেবিন ঘিরে বলছে সবাই
জ্ঞানহারা সেই সাহসী যে
মারা গেছে রাতে।

ঠেলা
মজুর মজুর মজুর
টানছে মজুর ঠেলা
রোদে পুড়ে মজুর
ভাঙছে মাটির ঢেলা
বস্তা মাথায় কুলি
পড়ছে ভীষণ নুয়ে
ঘুরছে প্যাডেল আহা
পড়ছে যে ঘাম চুঁয়ে।
মজুর মজুর মজুর
ভাঙছে তারা পাথর
পাঁচ আঙুলের ব্যথায়
হচ্ছে তারা কাতর
সারাটা দিন আহা
টানছে মাটির ঝুড়ি
তাদের হিসেব থেকেই
করছে মালিক চুরি!
গরিব ভোজ
গরিব ধরো গরিব মারো
রোজ একটা গরিব খাও
দেখবে তোমার শরীর কেমন
হবে রসের কোর্মা-পোলাও
গরিব কাটো গরিব বাটো
একটা গরিব রাঁধো রোজ
দেখবে তোমার ড্রয়িংরুমে
জমবে কেমন গরিব ভোজ।

মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম