
মাস্টারি বিডি । শান্তা ইসলাম
ফিচার । ঢাকা । ১০ এপ্রিল ২০১৯ । ২৭ চৈত্র ১৪২৫
ফুল একটি কিন্তু নাম অনেক। যেমন : ভাঁট ফুল, ভাইটা ফুল, ঘেঁটু ফুল, বনজুঁই, ঘণ্টাকর্ণ, রাজবেলি, ভান্ডিরা ইত্যাদি। ইংরেজিতেও বেশ কটি নাম রয়েছে, Hill Glory Bower, Sticky Glory Bower, Wild jasmine.। বৈজ্ঞানিক নাম : Clerodendrum viscosum.।

কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন-
“একদিন আমি যাব দু-প্রহরে সেই দূর প্রান্তরের কাছে,
সেখানে মানুষ কেউ যায় নাকে — দেখা যায় বাঘিনীর ডোরা
বেতের বনের ফাঁকে — জারুল গাছের তলে রৌদ্র পোহায়
রূপসী মৃগীর মুখ দেখা যায়, — শাদা ভাঁট পুষ্পের তোড়া
আলোকতার পাশে গন্ধ ঢালে দ্রোণফু বাসকের গায়;
তবুও সেখানে আমি নিয়ে যাবো একদিন পাটকিলে ঘোড়া
যার রূপ জন্মে—জন্মে কাঁদায়েছে আমি তারে খুঁজিব সেথায়।”

গ্রামের পথের ধারে প্রকৃতির নিয়মে সবার অগোচরে পরিচর্যা ছাড়া অবহেলা ভরে কত ফুল ফোটে; এক সময় ঝরেও যায়। কেউ দেখে না, মনেও রাখে না। এসব বনফুল বেশির ভাগ সময় প্রকৃতিপ্রেমী ও ফুলপ্রেমীদের চোখেও সহসা ধরা দেয় না। কখন গ্রামের কোন শিশু কিশোর খেলাচ্ছলে এসব অচেনা অজানা বনফুল কুড়িয়ে এনে সাজায় আপন খেলাঘর অথবা কোন প্রেমিক ভালবাসার অর্ঘ্য হিসেবে প্রেমিকার খোঁপায় পরিয়ে দেয় এ ফুল। এতেই হয়তো কোন বনফুল সার্থকতা খুঁজে পায় প্রকৃতির কাছে।

ভাঁট ফুল তেমনই এক বনফুল। অথচ সাহিত্য থেকে শুরু করে পৌরাণিক কাহিনী সবখানেই ঘেঁটু ফুল এসেছে বারবার। বেহুলা লখিন্দরের পৌরণিক অমর প্রেমের কাহিনীতে ভাঁট ফুল এসেছে নানাভাবে। লখিন্দরের সওদাগরী নৌকা বেহুলার বিনসারা গ্রামের ঘাটে পৌঁছলে ওদের প্রথম চোখাচোখি হওয়ার প্রণয়ের সাক্ষী হয়ে থাকে ভাঁট ফুল। প্রণয় পর্বে বেহুলা ভাঁট ফুলেরই মালা গেঁথে পরিয়ে দেয় লখিন্দরের গলায়। স্বামীকে ফিরে পেতে লখিন্দরের দেহ ভেলায় তুলে চারিধার ভাঁট ফুল দিয়ে সাজিয়ে বেহুলা রওনা হয় মনসা দেবীর উদ্দেশে। কবি লিখেছেন –
‘বাংলার নদী মাঠ ভাঁট ফুল ঘুঙুরের মতো কেঁদেছিল তার পায়…।’

আবার কোন পৌরণিকের মতে এই ভাঁট ফুলই হলো দেবতা। যার নাম ঘণ্টাকর্ন। ফাল্গুন সংক্রান্তিতে ওপার বাংলায় এখনও ঘেঁটু উৎসব হয়। এটি আসলে শিব-পার্বতীর পুজো।

ঘেঁটুফুল ছোট আকৃতির নরম শাখা প্রশাখা বিশিষ্ট গুল্ম জাতীয় গাছ। সাধারণত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার, আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এছাড়া মায়ানমার, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, মালয়েসিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের পতিত জমি, রাস্তার ধারে, জঙ্গলে অযত্ন অবহালেতেই এ ফুলের গাছটি অনায়াসেই জন্মে থাকে।

এর পাতা সবুজ, অমসৃণ এবং চারপাশে খাঁজ কাটা। পাতার নীচের শিরাগুলো স্পষ্ট। নরম লোমশ। পাতার আকার হৃদপিণ্ডাকৃতি অথবা ডিম্বাকৃতি, অগ্রভাগ ক্রমশ সরু। ওপরের পাতা লাল রংয়ের।

মার্চ-এপ্রিল মাসে ছোট ছোট গাছে তোড়ার মত লালচে পুষ্পদন্ডে থোকায় থোকায় অনেক ফুটে থাকতে দেখা যায় ভাঁট ফুল। ফুলের রং ধবধবে সাদা। প্রতিটি ফুলে ৫টি করে পাপড়ি থাকে। ভাঁট ফুল গন্ধ ছড়ায় রাতে।

সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে ভাঁট গাছ ও তার ফুলের ভেষজ গুণাগুণ মানব কল্যাণে বড় অবদান রেখেছে বহুকাল ধরে। ভাঁটের রস তিতা বলে সহজে কেউ খেতে চায় না।

মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম