ঢাকা, শুক্রবার ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ মাসস
শামীম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। সাকল্যে তাঁর মাসিক আয় ৭৫ হাজার টাকা। দুই সন্তান, স্ত্রী এবং মাকে নিয়ে থাকেন রাজধানীর উত্তরায়। মা ক্যান্সারে আক্রান্ত।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের ক্যান্সারের ওষুধের প্রায় ৯৫ শতাংশ চাহিদাই পূরণ করছে। কিন্তু দেশে উৎপাদিত এসব ওষুধের দাম কতটা ন্যায়সংগত? কতটা মানুষের নাগালের মধ্যে? সরকার এসব ওষুধ উৎপাদন এবং কাঁচামাল আমদানির ওপর কর ও শুল্ক মওকুফ করেছে। তার পরও এসব ওষুধের দাম বাড়ছে নিয়ন্ত্রণহীন। পেগফিলগ্রাস্টিমের দামের কথাই ধরা যাক। কোম্পানিভেদে এর দাম ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকা। ভারত এ ওষুধের দাম দেড় হাজার রুপি।
বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ হাজার টাকার কিছু বেশি। প্রশ্ন হলো— ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে ওষুধের মূল্য এত বেশি হওয়ার কারণ কী? কারণ হলো ওষুধের মূল্য নির্ধারণে সরকারের ব্যর্থতা এবং কোম্পানিগুলোর সিন্ডিকেট। সরকারের আইন অনুযায়ী, ওষুধের দাম নির্ধারণ করার কথা ওষুধ প্রশাসনের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের প্রধান কাজ হলো ওষুধের মান ও দাম নির্ধারণ। ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া বাজারে কোনো ওষুধ বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয়। কিন্তু বাজারে মানহীন নিম্নমানের ভেজাল ওষুধের যেমন অবাধ বিচরণ, তেমন ওষুধের দামের ওপরও নিয়ন্ত্রণ নেই সরকারের এ প্রতিষ্ঠানটির।
১৫ বছর ধরে ওষুধের দাম নির্ধারণ করত ‘দরবেশ’ হিসেবে পরিচিত সালমান এফ রহমানের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট। ওষুধশিল্পে সালমানের কথাই ছিল শেষ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ছিল তাঁর ভয়ে তটস্থ। এই সময়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সব ধরনের ওষুধের দাম ইচ্ছামতো বৃদ্ধির প্রচলন শুরু হয়। ওষুধ প্রশাসন বা সরকারকে না জানিয়েই সব ধরনের ওষুধের দাম বাড়ানো শুরু হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে গত পাঁচ বছরে সব ধরনের ওষুধের দাম অন্তত তিন গুণ বেড়েছে। আওয়ামী লীগের পতনের পর সবাই আশা করেছিল ওষুধের বাজারে এ সিন্ডিকেট ভেঙে যাবে। কিন্তু গত দেড় বছরে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। দেড় বছরে গ্যাস্ট্রিক, অ্যান্টিবায়োটিক, ডায়াবেটিসসহ বেশ কিছু রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত দুই ডজনের বেশি ওষুধের দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ক্রেতা ও বিক্রেতারা। এর মধ্যে কোনো কোনো ওষুধের দাম ১১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তাঁরা।
তেমনই একটি ওষুধের নাম ‘অ্যানাফ্লেক্স ম্যাক্স-৫০০’। গেঁটে বাতের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এ ওষুধটির প্রতিটি ট্যাবলেট ১০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ২১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর দাঁত ব্যথার ওষুধ মারভ্যান-১০০ মিলিগ্রামের ১০ পাতার একটি বক্স আগে যেখানে ৪০০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন সেটির দাম ৩০০ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০০ টাকায়। গ্যাস্ট্রিক, আলসারজনিত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ফ্যামোট্যাক ২০ মিলিগ্রামের এক পাতা ওষুধের দাম ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৪৫ টাকা করা হয়েছে।
একইভাবে অ্যাজমা, ফুসফুসজনিত সমস্যায় ব্যবহৃত ডক্সোমা ট্যাবলেটের প্রতি বক্স প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে এখন ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। অ্যানাফ্লেক্স ম্যাক্স-৫০০ ট্যাবলেট ১০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ২১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এ ওষুধের দাম ভারতে প্রতিটি ৩ রুপি। একই ওষুধের দামে এত পার্থক্য কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশি ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর লাগামহীন মুনাফা প্রবণতার কারণে এ মূল্যবৃদ্ধি। ওষুধের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে এমনিতেই মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। এর মধ্যে আবার পাওয়া যাচ্ছে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ওষুধ বিক্রির অভিযোগও। একেক ফার্মেসিতে একেক দামে বিক্রি করা হচ্ছে বিভিন্ন ওষুধ। ফার্মেসিগুলোর বিরুদ্ধে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ওষুধ বিক্রির অভিযোগ করেছেন অনেকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে।
যেমন প্যাকেটের গায়ে লেখা দাম অনুযায়ী, মিলক্যাল ট্যাবলেটের ৬০ বড়ির একটি কৌটার খুচরা বিক্রয়মূল্য ৬০০ টাকা। কিন্তু ঢাকার মিরপুর, গাবতলী, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, শাহবাগ, লালবাগ, বংশালসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোনো কোনো ফার্মেসিতে ওষুধটি ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। মূলত পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে গড়ে ওঠা ফার্মেসিতে ওষুধের দাম বেশি রাখতে দেখা গেছে। অন্যদিকে ওই একই ওষুধ অনলাইনভিত্তিক একাধিক প্ল্যাটফরমে ৫৫০ টাকায়ও বিক্রি করতে দেখা গেছে। রোগ একটাই, কিন্তু কোম্পানিভেদে সেটার ওষুধের দামে বেশ পার্থক্য লক্ষ করা যায় বাংলাদেশের বাজারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে দেশে সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকা ওষুধগুলোর একটি হচ্ছে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ।
স্বাস্থ্য খাতের তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক মার্কিন প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল স্ট্যাটিসটিকস হেলথ (আইএমএস হেলথ)-এর তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে এককভাবে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ১০টি ওষুধের মধ্যে পাঁচটিই গ্যাস্ট্রিকের। এর মধ্যে বিক্রির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ‘সার্জেল’। আইএমএস হেলথ তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের প্রথম ৯ মাসে ওষুধটির বিক্রির আর্থিক পরিমাণ ছিল ৯১৮ কোটি টাকা। হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির সার্জেল ২০ মিলিগ্রামের প্রতিটি ক্যাপসুল ফার্মেসিতে বিক্রি হচ্ছে ৭ টাকা দরে।
একই রোগের জন্য তৈরি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির সেকলো ২০ মিলিগ্রামের প্রতিটি ওষুধের দাম রাখা হচ্ছে ৬ টাকা। আবার গণস্বাস্থ্য ফার্মার জি-ওমিপ্রাজল ২০ মিলিগ্রামের প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৩ টাকায়। অন্যদিকে পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রোগাট মাপস ২০ মিলিগ্রামের একটি ওষুধের দাম রাখা হচ্ছে ৮ টাকা। দেড় বছরে যেসব ওষুধের দাম বেড়েছে, সেগুলোর জন্য ওষুধের কাঁচামাল, উৎপাদন ও প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করছে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো। কোম্পানিগুলোর দাবি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কাঁচামালের খরচ তো বেড়েছেই, তার চেয়েও বেশি বেড়েছে পরিচালন ব্যয়। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, ওষুধের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে সরকারের নজরদারি আরো বাড়াতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশে ওষুধ উৎপাদনের খরচ অনেক কম। কারণ ওষুধের কাঁচামাল, মেধাস্বত্বসহ অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার কাছ থেকে বাংলাদেশ ছাড় পেয়ে থাকে। কাজেই সেই ছাড় পাওয়ার পরও ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক, সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত। ওষুধের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আগস্টে সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের বাজারে শৃঙ্খলা আনতে ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে মূল্য নিশ্চিত করতে ২৬০টি ওষুধের দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু তা-ও কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইকিউভিআইএর তথ্য মতে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ৪৪ টাকা ব্যয় হয় শুধু ওষুধে, যেখানে বৈশ্বিক গড় মাত্র ১৫ শতাংশ।
২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপে দেখা যায়, ওষুধের উচ্চমূল্যের কারণে প্রায় ৬১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম