মাস্টারি বিডি ডটকম ।
সিলেট । ০২ মার্চ ২০১৮ । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৪
গ্রামীণ জনপদের উন্নয়ন ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকারের এ নীতি বাস্তবায়নে বিগত ৯ বছরে সিলেট জেলায় ৩৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮৮৭ কিলোমিটার পল্লী সড়ক নির্মাণ করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। এছাড়াও জেলার বিভিন্ন এলাকায় আরো ১৯০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।
পল্লী সড়ক শুধু সড়কই নয়; কর্মসংস্থান, জীবন ও জীবিকার অবলম্বন। পল্লী সড়কের অবস্থা ভালো হলেই কৃষি পণ্য পরিবহন সহজ হয়, কৃষক লাভবান হয়। দারিদ্রমুক্তি ও মানবসম্পদের উন্নয়নে পল্লী সড়কের ভূমিকা ও গুরুত্ব অপরিসীম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত দিনবদলের সনদ ‘রূপকল্প-২০২১’ এর বাস্তবায়নে পল্লী উন্নয়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার দায়িত্ব নেবার পর থেকে সিলেট জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এর আওতাধীন বিভিন্ন উপজেলার সাথে সিলেট জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিভিন্ন উপজেলার অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক সড়কগুলো নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ, সংস্কারেরও উদ্যোগ নেয়া হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সিলেট-গাছবাড়ি-কানাইঘাট সড়ক। ২০১০-১১ অর্থ বছরে প্রায় ১৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সিলেট-গাছবাড়ি-কানাইঘাট সড়কের প্রায় ১৭ কিলোমিটার নতুন করে নির্মাণ করা হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে হরিপুর-গাছবাড়ি সড়কে নির্মাণ করা হয় নতুন আরসিসি সড়ক, এতে ব্যয় হয় ১৭ কোটি টাকা।
কানাইঘাট উপজেলার উমরগঞ্জ গ্রামের স্কুল শিক্ষিকা আদিবা আক্তার বলেন, আমাদের এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই অবহেলিত ছিল। রাস্তাগুলোর অবস্থা ভালো ছিলোনা। আমাকে প্রতিদিন স্কুলে যাবার জন্য প্রায় ১৭ কিলোমিটার রাস্তা গাড়িতে যেতে হয়। ভাঙ্গাচোরা আর খানাখন্দে ভরা রাস্তার জন্য যেতে যেমন কষ্ট হতো, তেমনি ঠিক সময়ে পৌছানোও যেতোনা। তবে সম্প্রতি নতুন সড়ক নির্মাণ করায় এখন অনায়াসেই কর্মক্ষেত্রে যেতে পারি। এতে যে শুধু আমার সুবিধা হয়েছে তা কিন্তু নয়, পুরো এলাকাবাসীই এতে উপকৃত হয়েছেন। এতে এলাকার সামগ্রিক চেহারাই পাল্টে গেছে।
জেলার ওসমানীনগর উপজেলার সাথে বালাগঞ্জের যোগযোগ ব্যবস্থা সুগম করতে ২০১০-১১ অর্থ বছরে তাজপুর-বালাগঞ্জ সড়ক পুনঃনির্মাণ করা হয়। ১৪.৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরেের এ সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয় ১২ কোটি টাকা। এছাড়া খসরুপুর বাজার হতে পৈলনপুর হয়ে বালাগঞ্জ পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে ব্যয় হয় প্রায় ১৫ কোটি টাকা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম মহসিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, একটি গ্রামীণ জনপদের জীবনমান উন্নয়নের অন্যতম প্রধান উপকরণ হচ্ছে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেবার পর থেকে আঞ্চলিক সড়ক নেটওয়ার্ক সুবিন্যস্ত করার উপর জোর দেয়া হয়েছে। এ জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ অনুযায়ী আঞ্চলিক সড়কগুলো পুনঃনির্মাণ ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নতুন সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সিলেট কর্তৃক প্রায় ৮৮৭ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে, এছাড়া চলমান আছে আরো ১৯০ কিলোমিটার সড়ক। চলমান কাজ এবছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ করা যাবে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরো জানান, চলতি বছরেই গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আরো প্রায় ৭০ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণ করার জন্য ইতিমধ্যেই টেন্ডার আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে।
বিয়ানীবাজার হতে গজুকাটা পর্যন্ত সাড়ে ৬ কিলোমিটার রাস্তা পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে। এত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২ কোটি টাকা। গোলাপগঞ্জ উপজেলাধীন ঢাকা দক্ষিণ থেকে মোগলাবাজার পর্যন্ত প্রায় ৮.৫ কিলোমিটার সড়ক পুনঃনির্মাণ করা হয়।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম মহসিন আরো জানান, সিলেট জেলায় নতুন সড়কের পাশাপাশি পুরোনো সড়ক মেরামত ও রক্ষনাবেক্ষণ বাবদ বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ১৮৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এতে প্রায় ১ হাজার ২১৯ কিলোমিটার পল্লী সড়কের সংস্কার করা হয়েছে। টেকসই সড়ক উন্নয়নের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন সিলেট জেলার উল্লেখযোগ্য সড়কগুলো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জকিগঞ্জ উপজেলার জকিগঞ্জ-শ্যাওলা-দুবাগবাজার সড়ক। মোট ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে প্রায় ৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। এছাড়াও জকিগঞ্জ উপজেলাধীন আটগ্রাম হতে জকিগঞ্জ পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার করা হয়। এতে ব্যয় হয় প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা।
জকিগঞ্জ উপজেলার শাহগলী গ্রামের আকমল হোসেন জানান, একসময় সিলেট জেলা শহরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই নাজুক ছিলো। চারখাই থেকে শাহগলী পর্যন্ত রাস্তার অবস্থা এতো খারাপ ছিলো যে একান্ত জরুরি কাজ ছাড়া আমরা শহরে যেতে চাইতাম না। আমাদের ক্ষেতের ফসল স্থানীয়ভাবেই বিক্রি করতে হতো, খারাপ রাস্তার কারণে পরিবহন ব্যয় ছিলো দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। কিন্তু বর্তমানে এ রাস্তা মেরামত ও কিছু জায়গায় নতুন রাস্তা নির্মাণ করায় আমরা সহজে আমাদের কৃষিপণ্য শহরে নিয়ে যেতে পারি। যার ফলে আমাদের পণ্যের মূল্যও ভালো পাওয়া যায়, এতে এলাকার কৃষকেরা লাভবান হচ্ছে। আমাদের জীবনযাত্রার মানও বাড়ছে।
সিলেটে হতে গাছবাড়ি হয়ে কানাইঘাট প্রায় ৫৩ কিলোমিটার সড়ক মেরামত ও উন্নয়ন বাবদ ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ১৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা। সালুটিকর হতে সাহেব বাজার হয়ে হরিপুর পর্যন্ত প্রায় ৬.৪০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার করা হয়েছে। এছাড়া ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সালুটিকর হতে গোয়াইনঘাট বাজার পর্যন্ত প্রায় ২৪ কিলোমিটার সড়ক মেরামত করা হয়েছে।
প্রকৌশলী এএসএম মহসিন বলেন, পল্লী সড়ক নেটওয়ার্ক জোরদার হলে আমাদের গ্রামগুলোর জীবনমান আরো উন্নত হবে। কৃষি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দেশ এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ সরকারের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জন সম্ভব হবে। উন্নত দেশের উপযোগী উন্নত গ্রাম ও নগর গড়ার লক্ষ্যে এলজিইডি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বাসস
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম