মাস্টারি বিডি । শিমুল আহসান
সাহিত্য বিভাগ । ২৪ অক্টোবর ২০১৮ । ০৯ কার্তিক ১৪২৫
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে সারা দেশের ন্যায় খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও কক্সবাজারেও পালিত হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রবারণা পূর্ণিমা।
আজ বুধবার সকাল থেকে খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে বুদ্ধ পূজা, পঞ্চশীল-অষ্টশীল গ্রহণ, বুদ্ধমূর্তি স্নানসহ নানা আচাররীতি পালনের মধ্য দিয়ে প্রবারণা পূর্ণিমার আনুষ্ঠানিকতা পালিত হয়।

খাগড়াছড়ি শহরের য়ংড় বৌদ্ধ বিহারে মারমা সম্প্রদায় প্রবারণা পূর্ণিমা বা ওয়াগ্যে পেয়্যে উপলক্ষে সন্ধ্যায় স্থানীয় চেঙ্গী নদীতে মূয়রপঙ্খীতে করে প্রদীপ প্রজ্জলন ও ফানুস উৎসব করে।
গৌতম বৌদ্ধের আর্দশ মতে ভিক্ষুসংঘ আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে তিন মাস বর্ষাব্রত পালন শেষ হয় প্রবারণা পূর্ণিমার তিথিতে। আগামী একমাস বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ভিক্ষুদের নানা দানীয় বস্তু উপহার দিবেন। যেটিকে দানোত্তম কঠিন চীবরদানোৎসব বলা হয়।

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা যেন নির্বিঘ্নে প্রবারণা পূর্ণিমা পালন করতে পারে সেলক্ষ্যে বিহারগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
মহামতি বুদ্ধের জীবনের প্রতিটি ঘটনা পূর্ণিমা কেন্দ্রিক। তার জন্ম, গৃহত্যাগ, বুদ্ধত্ব ও মহাপরিনির্বাণ লাভ, বুদ্ধের প্রথম ধর্ম প্রচারের দিন সবই পূর্ণিমায়। তাই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রধান সব ধর্মীয় উৎসব হয় পূর্ণিমা কেন্দ্রিক।

প্রবারণা মানে ভুল-ত্রুটির নির্দেশ, আশার তৃপ্তি, অভিলাষ পূরণ ও ধ্যান শিক্ষা সমাপ্তি। সকল প্রকার ভেদাভেদ গ্লানি ভুলে গিয়ে কলুষমুক্ত হওয়ার জন্য ভিক্ষুসংঘ পবিত্র সীমা ঘরে সম্মিলিত হয়ে একে অপরের নিকট দোষ স্বীকার করেন। নিজের দোষ স্বীকারের মধ্যে মহত্ত্বতা আছে- তা বৌদ্ধ ভিক্ষুরা দেখাতে সমর্থ হন।
আভিধানিক বিচারে প্রবারণার অর্থ হল বরণ করা। অর্থাৎ সকল প্রকার অকুশল বা পাপকর্ম বর্জন বা বারণ করে কুশল কর্ম বা পুণ্যকর্ম সম্পাদন বা বরণ করার শিক্ষা দেয় প্রবারণা।
প্রবারণা পুর্ণিমার পরদিন থেকে শুরু হয় মাসব্যাপী কঠিন চীবর দান। এ তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুরা নিরলসভাবে শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার অনুশীলন করেন। বর্ষাব্রত বা বর্ষাবাস পালনের সময় (তিন মাস) প্রত্যেক বৌদ্ধ ভিক্ষুকে এক জায়গায় বা বিহারে অবস্থান করতে হয়।
এ সময়ের মধ্যে বিশেষ কয়েকটি কারণ ছাড়া এক রাতের জন্যও নিজ নিজ বিহারের বাইরে থাকা যায় না। যদি কোন ভিক্ষু এ নিয়ম ভঙ্গ করেন তাহলে ওই ভিক্ষু কঠিন চীবর লাভ করতে পারেন না। তিনমাস বর্ষাবাস শেষে নানা আনুষ্ঠানিকতায় দিবসটি পালন করা হলেও কক্সবাজারের রামু উপজেলায় বাঁকখালী নদীতে আয়োজন করা হয় জাহাজ ভাসা উৎসব।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৫ অক্টোবর) রামুর বাঁকখালী নদীতে অনুষ্ঠিত হবে এ উৎসব। এক সময় কক্সবাজারের চৌফলদন্ডী ও খুরুশকুলের রাখাইনরা এ উৎসবের আয়োজন করলেও কয়েক বছর ধরে শুধু রামুতেই এ উৎসব পালন করা হচ্ছে।
মহামতি বুদ্ধ রাজগৃহ থেকে বৈশালী যাওয়ার সময় নাগলোকের মহাঋদ্ধিমান (অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন) নাগেরা চিন্তা করলেন বুদ্ধপূজার এই দুর্লভ সুযোগ তারা হাতছাড়া করবে না। সঙ্গে সঙ্গে নাগলোকের পাঁচশত নাগরাজ (জাহাজের মত), পাঁচশত ঋদ্ধিময় ফনা বুদ্ধপ্রমুখ, পাঁচশত ভিক্ষুসংঘের মাথার উপর বিস্তার করল।
এভাবে নাগদের পূজা করতে দেখে দেবলোকের দেবতারা, ব্রহ্মলোকের ব্রহ্মরা বুদ্ধকে পূজা করতে এসেছিলেন। সেই দিন মানুষ, দেবতা, ব্রহ্মা, নাগ সবাই শ্বেতছত্র ধারণ করে ধর্মীয় ধবজা উড্ডয়ন করে বুদ্ধকে পূজা করেছিলেন। বুদ্ধ সেই পূজা গ্রহণ করে পুনরায় রাজগৃহে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। আর সেই শুভ সন্ধিক্ষণ ছিল শুভ প্রবারণা দিবস। মূলত এই হৃদয়ছোঁয়া চিরভাস্বর স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য বাংলাদেশের বৌদ্ধরা বিশেষ করে রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায় প্রবারণা দিবসে নিকটবর্তী র্বাঁকখালী নদীতে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য খঁচিত কাগজী জাহাজ ভাসিয়ে প্রবারণা উৎযাপন করেন।
জাহাজ ভাসার আয়োজনকে ঘিরে রামু উপজেলার প্রায় ত্রিশটি বৌদ্ধপল্লীতে চলে দীর্ঘ আনন্দ যজ্ঞ। এ উৎসবের স্থায়িত্বও দেড়-দুই মাস। আর এ উৎসব শত বছর ধরে মহাসমারোহে এখানে উদযাপন করা হচ্ছে।

হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে এ উৎসব প্রতিবছর সাম্প্রদায়িক মিলন মেলায় পরিণত হয়। এর আগে শুরু হয় জাহাজ তৈরির আনন্দ যজ্ঞ। মূলত জাহাজ তৈরির টাকা সংগ্রহকে ঘিরে চলে এ আনন্দায়োজন। বিভিন্ন বৌদ্ধ পল্লীতে বাঁশ, কাঠ, বেত, কাগজে রংয়ের কারুকাজ করে কারিগররা দৃষ্টিনন্দন এ কল্পজাহাজ তৈরি করেছেন।
রামুর প্রবীণ ছড়াকার ধনীরাম বড়ুয়া বলেন, আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই ঐতিহ্য অনেকটা হারাতে বসেছে। কয়েক বছর আগেও রাতের বেলায় কল্পজাহাজ তৈরি এবং পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে জাহাজের জন্য অর্থ সংগ্রহের আনন্দ ছিল আরেকটি উৎসবের মতো। কিন্তু দিন দিন আমরা সেই ঐতিহ্য হারাতে বসেছি।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম