Home / জাতীয় / তখন রাজ্জাক হওয়ার চেষ্টা ছিলো অনেকের-প্রয়াণ দিবসের শ্রদ্ধা
21 8 4

তখন রাজ্জাক হওয়ার চেষ্টা ছিলো অনেকের-প্রয়াণ দিবসের শ্রদ্ধা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২১ আগস্ট ২০২৫ মাসস

পঞ্চাশের দশকে ঢাকাই চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠলেও উর্দু চলচ্চিত্রের দাপট তখন তুঙ্গে; ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার সিনেমা হলগুলোতে যখন কলকাতার চলচ্চিত্র দেখানো বন্ধ হয়ে গেল; তখন এ দেশের সিনেমা জগতে রাজ্জাকের অভিষেক নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। তখন রাজ্জাক হওয়ার চেষ্টা ছিলো অনেকের

চিত্রনায়ক আলমগীর মনে করেন, মোহাম্মদ আলী, জেবা কিংবা দিলীপ কুমারদের মত তারকাদের চলচ্চিত্রের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করে রাজ্জাক বাংলা চলচ্চিত্রকে পৌঁছে দেন অনন্য স্থানে।

আলমগীরের ভাষ্য, “উর্দু আর হিন্দির দাপটের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাঙালিকে বাংলা সিনেমা দেখা শিখিয়েছেন রাজ্জাক সাহেব। এই দেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির তার কাছে চিরঋণী থাকা উচিত বলে আমি মনে করি।”

পাঁচশর বেশি চলচ্চিত্রের অভিনেতা আবদুর রাজ্জাক বাংলাদেশের মানুষের কাছে খ্যাত ‘নায়করাজ’ রাজ্জাক নামে। কলকাতার নাকতলার জমিদার বংশের এই সন্তানটি অভিনয়ে নিজেকে বিকশিত করার জন্য ১৯৬৪ সালে ঢাকা আসেন। এই শহরেও বহু সংগ্রামের পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। ঢাকাই সিনেমায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন তিনি।

উত্তম-সুচিত্রা আর সৌমিত্রে বুঁদ হয়ে থাকা পূর্ব বাংলার মধ্যবিত্ত বাঙালি সিনেমাপ্রেমীরা ষাটের দশকে বিকল্প খুঁজে পেয়েছিলেন রাজ্জাকে। তিনি হয়ে উঠলেন ঢাকাই ছবির ‘স্ক্রিন আইডল’। ঢাকাই সিনেপাড়ায় একাধারে শাসন করলেন দুই দশক; নায়ক হিসেবে।

২০১৭ সালের ২১ অগাস্টে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে অনন্তলোকে যাত্রা করেন নায়করাজ রাজ্জাক।

বৃহস্পতিবার তার প্রয়াণ দিবসের প্রাক্কালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে রাজ্জাককে নিয়ে স্মৃতিচারণে আরেক নন্দিত চিত্রনায়ক আলমগীর বললেন, “রাজ্জাক সাহেব আমাদের সবার চোখের মনি, অভিভাবক ছিলেন।

“আমরা যারা বাংলা চলচ্চিত্রে আছি। বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকদেরকে, সেই ষাটের দশকের শেষ দিক থেকে পরবর্তী সময়ে তিনি পথ দেখিয়েছেন। তিনি পথিকৃৎ।”

তিনি জন্মেছিলেন দেশভাগের আগে, ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে।

সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই অভিনয়ের সুযোগ তৈরি হয় তার। স্কুলের একটি অনুষ্ঠানে প্রথম মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন। সেই থেকে তার মধ্যে অভিনয়ের আগ্রহ তৈরি হয়। কলকাতায় থিয়েটারে যুক্ত হন, অভিনয়ও করেন।

নায়করাজের সঙ্গে পরিচয়ের স্মৃতি মনে পড়ে কী না, জানতে চাইলে নায়ক আলমগীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি তো ফার্ম গেটেরই ছেলে। রাজ্জাক সাহেব নাটক করতেন, ফার্মগেইটে থাকতেন। সেই হিসেবে উনাকে অনেক আগে থেকেই চিনতাম।

“পরে যখন চলচ্চিত্রের নায়ক হলেন, পত্রিকায় ছবি ছাপা হত। তখন আরেকভাবে চিনেছি। একটি চলচ্চিত্রে আমার গান গাওয়ার কথা ছিল, সেখানে রাজ্জাক সাহেবের সাথে অনেক আলাপ হয়েছিল।”

নায়করাজকে ‘গাইড এবং দার্শনিক’ হিসেবে মান্য করেন মন্তব্য করে আলমগীর বলেন, “রাজ্জাক সাহেবের সাথে আমার বয়সের পার্থক্য অন্তত দশ বছর। তিনি আমার দশ বছরের বড়। ১৯৭২ সালে আমি যখন চলচ্চিত্রে আসি। তিনি তখন চলচ্চিত্রে ভীষণ প্রতিষ্ঠিত।”

নায়করাজের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল জানিয়ে আলমগীর বলেন, “উনি ছিলেন আমার ফ্রেন্ড, আমার ফিলোসফার এবং আমার গাইড। বয়সে বড় হলেও আমরা বন্ধুই ছিলাম।”

রাজ্জাক থেকে নায়করাজ

কলকাতায় কলেজে পড়ার সময় রাজ্জাক ‘রতন লাল বাঙালি’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন।

নায়ক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৬১ সালে মুম্বাই গিয়ে সিনেমা বিষয়ে কিছুদিন পড়াশোনা করেন। মুম্বাই থেকে ফিরে কলকাতার ‘পংকতিলক’ ও ‘শিলালিপি’ নামে দুটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মত নায়কদের দাপটে তিনি ছিলেন একবারেই মলিন।

এ অবস্থার মধ্যেই হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার ভেতর ১৯৬৪ সালে ঢাকায় চলে আসেন রাজ্জাক। বাংলাদেশের বা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র জগৎ তখন বিকশিত হচ্ছে। রাজ্জাক ভাবলেন, টালিগঞ্জের চেয়ে ঢাকায় সুযোগের সম্ভাবনা অনেক বেশি।

অবশ্য ঢাকাতেও তাকে প্রচুর সংগ্রাম করতে হয়েছে। তখন তিনি বিবাহিত। আর্থিক সঙ্কট যেমন ছিল, তেমনি ছিল প্রতিষ্ঠার পথে নানা বাধা।

১৯৬৪ সালে বর্তমান বাংলাদেশ টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হলে সেখানে অভিনয়ের সুযোগ নেন রাজ্জাক। তখন ধারাবাহিক নাটক ‘ঘরোয়া’য় অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল চলচ্চিত্রে অভিনয় করা। আবদুল জব্বার খানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ পান তিনি, তবে নায়ক হিসেবে নয়। সহকারী পরিচালক হিসেবে।

সেই সময়ের সংগ্রামের কথা রাজ্জাক নিজেই বলে গেছেন এভাবে- “আমি আমার জীবনের অতীত ভুলি না। আমি এই শহরে রিফিউজি হয়ে এসেছি। স্ট্রাগল করেছি, না খেয়ে থেকেছি। যার জন্য পয়সার প্রতি আমার লোভ কোনোদিন আসেনি।”

সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার মধ্যেই ‘তেরো নাম্বার ফেকু ওস্তাগার লেন’ চলচ্চিত্রে ছোট একটি ভূমিকায় অভিনয় করেন রাজ্জাক। এরপর ‘ডাকবাবু’, উর্দু ছবি ‘আখেরি স্টেশন’সহ কয়েকটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন।

এক সময় জহির রায়হানের নজরে পড়েন রাজ্জাক। ‘বেহুলা’ সিনেমার অভিনেত্রী সুচন্দার নায়কের চরিত্রে জহির রায়হান নেন রাজ্জাককে। এই সিনেমায় লখিন্দরের ভূমিকায় অভিনয় করে রাজ্জাক পেয়েছিলেন পাঁচ হাজার টাকা। এরপর জহির রায়হানের ‘আগুন নিয়ে খেলা’ সিনেমা করে পেলেন সাত হাজার টাকা।

সুচন্দার পর শবনম, কবরী, ববিতা, শাবানাসহ তখনকার প্রায় সব অভিনেত্রীকে নিয়ে একের পর এক ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র দেন ঢালিউডকে।

এর মধ্যে রাজ্জাক-কবরী জুটি ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়। সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘আবির্ভাব’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে রাজ্জাক-কবরী জুটির শুরু। এরপর তারা অভিনয় করেছেন বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে। তবে রাজ্জাক অভিনীত জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমাটি বাংলা চলচ্চিত্রের একটি মাইলফলক।

রাজ্জাকের সাড়া তোলা আরো কিছু চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ময়নামতি’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘ঢেউ এর পরে ঢেউ’, ‘রংবাজ’, ‘বেঈমান’, ‘আনোয়ারা’, ‘সুয়োরাণী-দুয়োরাণী’, ‘দুই ভাই’, ‘মনের মতো বউ’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘নীল আকাশের নীচে’।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রাজ্জাক অভিনীত ‘রংবাজ’ দিয়ে ঢাকাই চলচ্চিত্রে অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রের সূচনা হয়। এরপর ‘পিচ ঢালা পথ’, ‘স্বরলিপি’, ‘কি যে করি’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘বাঁদী থেকে বেগম’, ‘আনার কলি’, ‘বাজিমাত’, ‘লাইলি মজনু’, ‘নাতবউ’, ‘মধুমিলন’, ‘অবুঝ মন’, ‘সাধু শয়তান’, ‘পাগলা রাজা’, ‘মাটির ঘর’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘কালো গোলাপ’, ‘নাজমা’সহ বহু ব্যবসা সফল চলচ্চিত্রের নায়ক হিসেবে রাজ্জাককে পর্দায় দেখেছে দর্শক।

নায়িকা ববিতা বলেছিলেন, তার ক্যারিয়ারের সফল সিনেমাগুলোই তিনি করেছেন রাজ্জাকের সঙ্গে। রাজ্জাক-ববিতা জুটিকে বলা হয় অন্যতম সেরা রোমান্টিক জুটি। এছাড়া তুমুল জনপ্রিয়তা আসে রাজ্জাক-কবরী জুটিতেও। ময়নামতি’ সিনেমার শুটিং থেকে পর্দার বাইরের জীবনে কবরীর বন্ধু হয়ে ওঠেন রাজ্জাক। বন্ধুত্ব এবং সিনেমার অলিগলিতে ঘুরতে গিয়ে কবরী একসময় কীভবে ‘হারিয়ে গিয়েছিলেন’ ব্যক্তি রাজ্জাকের ভেতরে, সেই গল্প প্রয়াত এই চিত্রনায়িকা লিখে রেখে গেলেন তার ‘স্মৃতিটুকু থাক’ বইয়ে।

সুচন্দা, ববিতা ও কবরী ছাড়াও পরের দিকে বহু সিনেমায় রাজ্জাক শাবনার সঙ্গে জুটি বেঁধে কাজ করেছেন।

অভিনয়ের জন্য রাজ্জাক পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কারসহ অনেক সম্মাননা। ২০১৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয় তাকে। ২০১৫ সালে তিনি পান স্বাধীনতা পুরস্কার।

‘বদনাম’, ‘সৎ ভাই’, ‘চাপা ডাঙ্গার বউ’সহ প্রায় ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনাও করেছেন রাজ্জাক। অভিনয় জীবনের বাইরে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের শুভেচ্ছা দূত হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি ।

সূত্র : বিডিনিউজ২৪

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

14 4 26 244

২৫ বছরেও শেষ হয়নি রমনার বটমূলে বোমা হামলা মামলার বিচার

ঢাকা, মঙ্গলবার ১৪ এপ্রিল ২০২৬ মাসস ২৫ বছর আগে রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা হামলার …