Home / জাতীয় / গ্রামের বাড়িতে গেলে সময়করে নলতা গ্রামের মাজার শরীফে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসি । আফজাল হোসেন
29 25 12 1

গ্রামের বাড়িতে গেলে সময়করে নলতা গ্রামের মাজার শরীফে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসি । আফজাল হোসেন

ঢাকা, সোমবার ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ মাসস

স্মৃতিকথা

নলতা হাইস্কুল, হজরত খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (র.) ও দরবেশ আলী স্যারকে নিয়ে গত শতকের সত্তরের দশকের স্মৃতিকথা এঁকেছেন অভিনেতা নির্ম াতা Afzal Hossain বলে রাখা ভালো আমিও নলতা হাইস্কুলের ছাত্র। 

ছয় ক্লাসে ওঠার পর আব্বা ঠিক করেছিলেন, আমাকে বাড়িতে রাখলে, লেখাপড়া কিচ্ছু হবে না।
বাড়ি থেকে ছয় মাইল দূরে খুলনা জেলার নামকরা একটা স্কুল ছিল, নলতা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়। ঐ অঞ্চলের যেসব ছেলেদের বাবা মা নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন না, ভর্তি করে দিয়ে আসতেন সে বোর্ডিং স্কুলে। স্কুলটা ছিল দুরন্তদের ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করা এবং পড়াশোনায় ভালো ছাত্র বানিয়ে তোলার কারখানা।
শৃঙ্খলা শেখানো এবং সর্বস্তরে তার অনুশীলন, চর্চা করানো ছিল সে স্কুলের প্রথম ও প্রধান ভূমিকা।
স্কুলটা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হজরত খানবাহাদুর আহছানউল্লা (র.) তাঁকে জ্ঞানতাপসও বলা হয়। তিনি ছিলেন আল্লাহর সাধক, ধর্মগুরু। তাঁর নামের আগে উচ্চারণ করা হয়, হযরত। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে তাঁর অজস্র ভক্ত, মুরীদ। এতকাল পরেও সব ধর্মের মানুষের কাছে তিনি, নলতায় তাঁর মাজার শরীফ সমান আগ্রহের হয়ে আছে।
তিনি পীর, ধর্মগুরু, দার্শনিক। এসবের পরে আরও এক বিশেষ পরিচয় জানতে পারলে তিনি কতটা উচ্চতর পর্যায়ের জ্ঞানী, বোঝা যায়। তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার শিক্ষা বিভাগের ডেপুটি ডাইরেক্টর। তিনি অনেকভাবে ছিলেন বিশেষ- বৃটিশ সরকার খানবাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন তাঁকে।
সোজা বানানোর জন্য আমাকে নলতা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হলো। হোস্টেলে থাকতে হবে। ভোরবেলা আজান দিলে উঠতে হবে, তারপর পুকুরঘাটে গিয়ে অজু করে যেতে হবে মসজিদে। নামাজ দিয়ে শুরু করতে হতো দিন।
সে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের নাম দশ গ্রামের মানুষের সমীহের সাথে উচ্চারণ করতেন। মৌলবী দরবেশ আলী অসাধারণ এক শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে স্যারকে পাকিস্তান সরকার তমঘা-ই- খিদমাত সম্মানে ভূষিত করেছিলেন।
সে স্কুলে পড়া না পারলে বেত দিয়ে মার দেওয়ার রীতি ছিল। নামাজ না পড়াও ছিল বড়ো মাপের অপরাধ।
দুপুরে টিফিনের ঘন্টা বাজলে সবার জন্য মাঠের দিকের বড়ো গেটটা খুলে দেয়া হতো। সে গেট, মাঠ আমাদের জন্য ছিল না। খেলাধুলা করে আনন্দে সময় কাটাতে পারতো, অন্য ধর্মাবলম্বী ছাত্ররা।
আমাদের জন্য খুলে দেয়া হতো পুকুর ঘাট, মসজিদের দিকের গেটটা। মসজিদের গেটে হেড স্যার দাঁডিয়ে থেকে দেখতেন, কে এলো, কে এলো না। অত ছাত্রের মুখ তিনি কিভাবে মুখস্ত রাখতেন কে জানে!
টিফিন শেষ হয়ে গেলে ক্লাসে ক্লাসে বেত হাতে ঢুকতেন হেডস্যার।
নামাজ যারা পড়তে যায়নি, ক্লাসে স্যার ঢুকলে তারা দাঁড়িয়ে থাকবে- এটা ছিল নিয়ম। দাঁড়িয়ে থাকা কোন ছাত্রকে তিনি জিজ্ঞাসা করবেন না, কেনো নামাজ পড়তে যাওনি।
যার সামনে গিয়ে স্যার দাঁডাবেন, সে ছাত্রকে বেত্রাঘাত গ্রহনের জন্য হাত মেলে দিতে হবে। সবাই জানতো, স্যার দু ঘা দিয়ে শেষ করতে পারেন, মেজাজ যদি ঠিক না থাকে, কপালে চার পাঁচ ঘা ও জুটতে পারে।
নামাজ যে বা যারা পড়তে যায়নি, বসে থেকে স্যারকে ফাঁকি দেবার উপায় ছিল না। কেউ তেমন চেষ্টা করলে স্যার ধরে ফেলতে পারতেন এবং তা হতো অপরাধের উপরে অপরাধ। শাস্তি পেতে হতো দ্বিগুন।
মুখে কাঁচা পাকা দাড়ি, মাথায় সাদা টুপি, পরণে সাদা পাজামা, পান্জাবি আর পান্জাবির উপরে সাদা চাদর জড়ানো। মানুষটা চলা ফেরায় ছিলেন ধীর স্থির, চোখজোডা ছিল বড়ো কিন্তু খুবই ঠান্ডা ধরণের। সবাই যমের মতো ভয় পেতাম মানুষটাকে কিন্তু তিনি কখনো কারো সাথে রেগে কথা বলেননি।
হেড স্যার অন্যায় করা খুবই অপছন্দ করতেন এবং একটাই শাস্তি দিতে জানতেন- বেত্রাঘাত। বেত্রাঘাত দুইরকমের ছিল। হাত পেতে নেয়া এবং বেণ্চের উপর দাঁড়া করিয়ে দিয়ে শপাং শপাং মার খাওয়া।
তাঁর সে বেত ছিল বিশেষ। চারটে চিকন বেত একত্রে বাঁধা। স্যারের সন্তানেরাও সতর্ক থেকেছে, সে বেত্রাঘাতের শিকার যেনো না হতে হয়।
এতদিন পর আমার সে স্কুল, স্কুলের মহান প্রতিষ্ঠাতা, জ্ঞান অর্জনের নিয়ম কানুন, কোমল কিন্তু কঠিন হেড স্যার, তাঁর ভূমিকা নিয়ে ভাবছি কেনো? না ভেবে পারবো কি করে! সে প্রতিষ্ঠান, মহান মানুষেরাই তো এই জীবনের ভিতটা গড়ে দিয়েছিলেন। আজ পর্যন্ত সে ভিতের বাইরে পা বাড়াবার শক্তি ও সাহস কোনটাই হয়নি।
স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা হজরত খানবাহাদুর আহছানউল্লা (র.) এর জীবনদর্শন ছিল “স্রষ্টার এবাদত, সৃষ্টির সেবা”। তার মাজার শরীফে সকল ধর্মের মানুষ গিয়ে প্রার্থনা করেন। সে অসাধারণত্ব দেখে শুনে ও বুঝে আমরা বড়ো হয়েছি। দেশে বিদেশে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত আহছানিয়া মিশন ধর্ম বেছে নয়, মানুষের কল্যান, শিক্ষাদান ও সেবায় রত আছে।
এখনো গ্রামের বাড়িতে গেলে সময় করে নলতা গ্রামের মাজার শরীফে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসি।
হেড স্যার তাঁর ছাত্রছাত্রীদের কখনই শেখাননি নিয়মিত নামাজ আদায়, ধর্ম পালন করলে বেহেস্তে যাওয়া যাবে।
তিনি বলতেন, দুনিয়া বেহেস্তের মত জায়গা হতে পারে, যদি লেখাপড়া এবং ধর্ম পালন উভয়ই মন দিয়ে করতে পারো। বলতেন, নামাজ আদায় হচ্ছে মানুষকে শৃঙ্খলায় রাখবার প্রক্রিয়া। নামাজের প্রতি আগ্রহ মানুষকে সচেতন, নিয়মের মধ্যে রাখে। দিনের নামাজগুলো পড়তে চাইলে, যে কোনো মানুষ সতর্ক, সাবধানে থাকে। এভাবেই ভালো থাকা হয়।
ছাত্রদের তিনি বোঝাতেন, অনেক অনেক মানুষের ভালো থাকবার এরকম চেষ্টায় পৃথিবী পরিচ্ছন্ন থাকে। অন্যায়, মন্দ কিছু করতে মনে ভয় তৈরি হয়। তাতে পৃথিবী, দেশ ও মানুষ ভালো থাকে।
নতুন কালের নতুন মানুষেরা অন্যরকম করে বলে। প্রায় পুরোটা জীবন তাহলে কি ভুল ধারণায় কেটে গেছে! নতুন কালের বয়ানে এই প্রাচীন মন বিপন্নবোধ বোধ করে। সামনে তাকিয়ে সুখ অনুভব করার চেয়ে পিছনে তাকিয়ে গৌরববোধ করতে হয়, এ বড়োই বেদনার কথা।
Monirul Islam Prism ওয়াল থেকে নেয়া

About Mastary Sangbad

Mastary Admin

Check Also

19 4 24 7

সংসদের কেনাকাটায় হরিলুট

ঢাকা, রবিবার ১৯ এপ্রিল ২০২৬ মাসস মাত্র ৪ হাজার টাকার ব্যাগের দাম ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার …