মাস্টারি বিডি ডটকম
শেখ নজরুল ।। ঢাকা । ২০ নভেম্বর ২০১৬ । ০৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩

শীতের অতিথি পাখির জন্য একসময় বাংলাদেশ ছিল একটি প্রিয় মাইগ্রেটিভ জোন। ঠিক কবে থেকে তারা বাংলাদেশে আসা শুরু করে তার সঠিক হিসাব না থাকলেও তাদের আগমনের ইতিহাস যে পুরাতন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অধুনিক সভ্যতার অনেক আগেই বরং তাদের আগমন ছিল অবাধ এবং অগুনতি। সময়ের বিবর্তনে পাখির প্রতি মানুষের সার্বিক ভালোবাসা কমতে থাকে। মানুষের মনই ফুল-পাখি থেকে সরে গেছে। রসনা বিলাসে সুন্দর-অসুন্দর বিবেচনাহীন হওয়ায় অবাধে শুরু হয় অতিথি পাখি নিধন। যথাযথ শাস্তি বিধান না থাকায় এবং পরিবেশ সচেতনতার অভাবে বাড়তে থাকে অবৈধ পাখি শিকারির সংখ্যা।
সতীর্থদের শিকারে পরিণত হবার পর তাদের রক্তাক্ত দেহ আর করুণ কান্না কোনো না কোনোভাবে অন্যদের মনে ভীতি সঞ্চার করে। কমতে থাকে অতিখি পাখির সংখ্যা এবং প্রজাতি। পাশাপাশি নানা দুর্যোগে দেশীয় পাখি প্রজাতির সংখ্যাও কমতে থাকে আশঙ্কাজনকভাবে। বিশেষ করে সুন্দরবনে বসবাসরত দুর্লভ প্রজাতির পাখির সংখ্যা কমতে থাকে। একসময় যেখানে প্রায় ৪৫০ প্রজাতির পাখির অস্তিত্ব ছিল আজ তার সংখ্যা হাতেগোনা। এটি একদিকে যেমন প্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে অন্যদিকে ইকো ফরেস্ট ভাবনাকে প্রতিহত করছে। নষ্ট হচ্ছে সার্বিক পরিবেশ এবং জীবনের নির্মল অধিবাস।
শীতের শুরুতেই আজও অতিথি পাখিরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, মিরপুর, চট্টগাম, বরিশাল, সিলেট, কিশোরগঞ্জের হাওর-বাঁওড়সহ বিভিন্ন জলাশয়ে আসে। পূর্বের বছরগুলোতে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের মধ্যে এসব অতিথি পাখি প্রজাতির প্রায় সবাই বাংলাদশের এসব অঞ্চলে এসেছিলো।
এ বছর এখনও শীত অনুভূত না হলেও পাখির মাইগ্রেটিভ যাত্রা শুরু হয়েছে। প্রায় ৬ হাজার অতিথি পাখি এবং বাংলাদেশের স্থানীয় বহু প্রজাতির পাখি জলাশয়গুলোতে অবস্থান নেবে। প্রাকৃতিক জলাশয় শুকিয়ে যাওয়া, অপরিকল্পিতভাবে নেপিয়ার ঘাস কেটে ফেলা, পরিবেশ সংরণের অভাব, মানুষ কর্তৃক অতিথি পাখিদের বিরক্তি করার কারণে পাখিদের মাইগ্রেশনের হার ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। গত বছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে প্রীতিলতা হলের পাশে মাত্র দুটি জলাশয়ে অতিথি পাখির অস্থায়ী আবাস চোখে পড়েছে। প্রায় ৩১ প্রজাতির অতিথি পাখি এবং ১২৮ প্রজাতির স্থানীয় পাখি শীতের শুরুতে এইসব জলাশয়ে অবস্থান নিয়েছিল।
জলাশয়গুলোর নির্মল ছায়ায় পাশাপাশি বসে পাখিদের ডুবসাঁতার, খুনসুটি, ডানা ঝাপটানো এবং কলকাকলি শুনে অনেক পাখিপ্রেমীর সময় পার হয়। একই সময়ে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণে ভিড়ের কারণে অনেক অতিথি পাখি অসুবিধা সত্ত্বেও জলাশয়ে অবস্থান করতে বাধ্য হয়। পাখিরা খাদ্য সংগ্রহের জন্য আশেপাশের শস্যতে এবং নদীতে যায়।
হাকালুকি, হালিহাওর, নিঝুম দ্বীপ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশের প্রায় ১২৮ প্রজাতির পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির আগমন ঘটে।
মূলত সাইবেরিয়া, হিমালয়, অরুণাচল, চীন ও মঙ্গোলিয়া থেকে বহু প্রজাতির অতিথি পাখি হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আসে। এর আগের বঝরগুলোতে আগত অতিথি পাখিদের মধ্যে ১০ প্রজাতির পাখিকে গাছপাখি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিছু অতিথি পাখি বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবেও ব্যবহার করে এবং এখান থেকে সময়মতো তারা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশে চলে যায়।

প্রতি বছর এখানে যেসব পাখি আসে তার বেশিরভাগই হাঁস প্রজাতির। বাংলাদেশে আগত অতিথি পাখিদের মধ্যে সরালি, পচার্ড, গার্গেনি, ছোট জিরিয়া, মানিকজোড়, জলপিপি, গোলবনহাঁস, নাকতা, খঞ্জনা, চিত্তাটুপি, পাতিভুতি, চামটঠুটি, লাল গুড়গুড়ি, পাতির হাঁস, ডেঙ্গা প্রভৃতি অন্যতম। আগত ৯৯ ভাগ ছোট লেজের পাখিকে বলা হয় ছোট শারলি এবং লম্বা লেজের পাখিকে বলা হয় বড় শারলি।
২০০৪ সালে কিছু সাইবেরিয়ান বালিহাঁস এবং হরিয়াল নিহত হবার পর এদের আর এখানে দেখা যায় না। তেমনিভাবে ১৯৯২ সালের পর খুনতি হাঁসের আগমন বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতি বছরের মতো গতবছরও কাপ্তাই লেকে বহু অতিথি পাখি এসে ভিড় জমিয়েছিল।
কাপ্তাই লেকের পাশাপাশি হাজারীবাগ, বালুখালি, লংগুদু, হাজাছড়া, বিলছড়া, বরকল এবং কাঁচলং এলাকায় বহু প্রজাতির অতিথি পাখির আগমন ঘটে। তাবে তা প্রতিবছর কমে আসছে।
১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধ স্থাপনের পর এর প্রায় ৫৮,৩০০ হেক্টর এলাকা জলাশয়ের আওতায় আসে এবং তার পরপরই এখানে অতিথি পাখিদের আগমন শুরু হয়। বরিশাল এলাকায় অতিথি পাখিদের বসবাস চিত্র একটু ভিন্ন। ভোলাতে সারস, ছাক্কাসহ হাজার হাজার অতিথি পাখি শিকারে পরিণত হয়। এসব ধৃত পাখি শিকারির এজেন্টরা বাইসাইকেলে এলাকার বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর নাকের ডগায় প্রকাশ্যে বিক্রি করে বেড়ায়। এদের ওজন প্রায় ১০০-৩০০ গ্রাম যা বিক্রির ক্ষেত্রে বেশ লোভনীয়।
সাইবেরিয়ান দ্বীপসমূহ থেকে মিরপুর চিড়িয়াখানা সংলগ্ন জলাশয়ে এক সময় হাজার হাজার অতিথি পাখির আগমন ঘটত। কিন্তু পূর্বের জলাশয়গুলি ভরাটের কারণে অতিথি পাখিদের আগমন অনেক কমে গেছে। এখনও মিরপুর এলাকায় যেসব জলাশয় অবশিষ্ট তাতে বুলবুল, দোয়েল, কোকিল, পেঁচা প্রজাতির অনেক পাখির আগমন লক্ষ্যণীয়।
পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনও বছরে প্রায় ৪০ প্রজাতির ৫ লক্ষ্যাধিক অতিথি পাখির আগমন ঘটে। যার মধ্যে অনেক প্রজাতি বাগানে বসবাস করে। আশুলিয়া, গুলশান, বারিধারা লেকে শীতে কোনো অতিথি পাখি দেখা যায় না। মুন্সীগঞ্জ এবং মানিকগঞ্জ পদ্মা বেসিনেও আগের মতো পাখিদৃশ্য বিরল।

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য পাখিবৈচিত্র্য রক্ষার প্রয়োজন। পাখির জন্য অবাধ বিচরণত্রেও আবশ্যক। প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোকে পরিষ্কার করাসহ তাদের খাদ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করতে পারলে এদের আগমন আরও বৃদ্ধি পাবে। পাখির প্রতি ভালোবাসা এবং তাদের রায় সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যে এবং পাখি নিধন বন্ধে মানুষের ভালোবাসা সৃষ্টি করতে পাখিমেলা আয়োজন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রয়োজনে পাখি নিধনে কঠোর আইন প্রণয়নসহ পূর্বের আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য গড়ে তোলা জরুরি, তা না হলে দিন দিন অতিথি পাখির আগমন কমে আসবে। হুমকির সম্মুখীন হবে জীববৈচিত্র্য, যা সার্বিক পরিবেশের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতে বাধ্য।
মাস্টারি সংবাদ মাস্টারি সংবাদে আপনাকে স্বাগতম